বিষয়বস্তুতে চলুন

প্লাস্টিসাইজার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পয়ঃনিষ্কাশন পাইপে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত পিভিসি প্লাস্টিসাইজারের কারণে ব্যবহারযোগ্য হয়েছে।[১]

প্লাস্টিসাইজার হলো এমন একটি পদার্থ, যা কোনো উপাদানকে নরম ও অধিক নমনীয় করতে, এর প্লাস্টিকতা বাড়াতে, এর সান্দ্রতা কমাতে এবং উৎপাদনের সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে ঘর্ষণ কমাতে যোগ করা হয়।[১][২]

প্লাস্টিসাইজার সাধারণত পলিমার ও প্লাস্টিকে, যেমন পিভিসি, যোগ করা হয়। এর উদ্দেশ্য হতে পারে উৎপাদনের সময় কাঁচামালের প্রক্রিয়াকরণ সহজ করা অথবা চূড়ান্ত পণ্যের ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা। পিভিসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্লাস্টিসাইজার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত প্লাস্টিক। প্লাস্টিসাইজার না থাকলে পিভিসি শক্ত ও ভঙ্গুর হয়; কিন্তু প্লাস্টিসাইজার যোগ করলে এটি ভিনাইল সাইডিং, ছাদ নির্মাণ, ভিনাইল মেঝে, বৃষ্টির নালা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, এবং বৈদ্যুতিক তারের নিরোধক ও আবরণ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।[১]

ঢালাই সহজ করার জন্য কংক্রিটের মিশ্রণেও প্লাস্টিসাইজার প্রায়ই যোগ করা হয়। এতে মিশ্রণ অধিক কার্যোপযোগী ও তরল হয় এবং পানির পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়। একইভাবে, ছাঁচে ঢালা ও আকৃতি দেওয়ার আগে কাদামাটি, স্টুকো, কঠিন রকেট জ্বালানি এবং অন্যান্য পেস্টজাত উপাদানেও এগুলো প্রায়ই যোগ করা হয়। এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্লাস্টিসাইজারের সঙ্গে বিচ্ছুরকের কার্যকারিতার যথেষ্ট মিল রয়েছে।

পলিমারের জন্য

[সম্পাদনা]
২০১৭ সালে ইউরোপ ও বিশ্বে ধরনভেদে প্লাস্টিসাইজারের ব্যবহার
২০১৭ সালে ইউরোপে প্লাস্টিসাইজারের ব্যবহার
২০১৭ সালে ইউরোপের প্লাস্টিসাইজার বাজারের প্রবণতা

পলিমারের জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিসাইজার কঠিন পদার্থ অথবা কম উদ্বায়ী তরল হতে পারে। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্লাস্টিসাইজারের মোট বাজারের পরিমাণ ছিল ৭৫ লক্ষ মেট্রিক টন। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকায় প্রায় ১০.১ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ইউরোপে ১৩.৫ লক্ষ মেট্রিক টন ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন চূড়ান্ত ব্যবহারক্ষেত্রে এসব প্লাস্টিসাইজারের ব্যবহার বিভক্ত। রাসায়নিক ধরনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে কম আণবিক ভরের অর্থো-ফথালেট থেকে অধিক আণবিক ভরের অর্থো-ফথালেট ও অন্যান্য বিকল্প ধরনের দিকে প্রবণতা দেখা গেছে।

পলিমার প্লাস্টিসাইজারের প্রায় ৯০ শতাংশ, যার মধ্যে থ্যালেট এস্টার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, পিভিসিতে ব্যবহার করা হয়। এতে উপাদানটির নমনীয়তা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়।[৩] যেসব অন্যান্য পলিমারে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিসাইজার থাকতে পারে, তার মধ্যে অ্যাক্রিলেট এবং সেলুলোজ-জাত প্লাস্টিক, যেমন সেলুলোজ অ্যাসিটেট, নাইট্রোসেলুলোজ ও সেলুলোজ অ্যাসিটেট বিউটেরেট, উল্লেখযোগ্য।

কার্যপ্রণালির প্রক্রিয়া

[সম্পাদনা]

প্লাস্টিসাইজারের অণুগুলো পলিমারের অংশ না হয়ে পলিমার দ্বারা গঠিত ম্যাট্রিক্সের মধ্যে স্থির থাকে। প্রচলিত ধারণা ছিল, প্লাস্টিসাইজার পলিমারের শৃঙ্খলগুলোর মধ্যে প্রবেশ করে সেগুলোকে পরস্পর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, ফলে "মুক্ত আয়তন" বৃদ্ধি পায়,[৪][৫] অথবা শৃঙ্খলগুলোকে স্ফীত করে। এর ফলে প্লাস্টিকের কাচীয় রূপান্তর তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং উপাদানটি নরম হয়। পরে দেখা যায়, মুক্ত আয়তনের এই ব্যাখ্যা প্লাস্টিকায়নের সব প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে না।[৬] প্লাস্টিসাইজারের উপস্থিতিতে পলিমার শৃঙ্খলের গতিশীলতা সরল পলিমার শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে ফ্লোরি–ফক্স সমীকরণ যে ধরনের পূর্বাভাস দেয়, তার তুলনায় অধিক জটিল।

প্লাস্টিসাইজারের অণুগুলো শৃঙ্খলের গতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করে; পলিমার শৃঙ্খলের প্রান্তের চারপাশে মুক্ত আয়তন বৃদ্ধি পায় না। প্লাস্টিসাইজার বা পানি যদি পলিমারের জলপ্রিয় অংশের সঙ্গে হাইড্রোজেন বন্ধন তৈরি করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট মুক্ত আয়তন কমে যেতে পারে। [স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন][৭]

স্থিতিস্থাপক গুণাঙ্কের ওপর প্লাস্টিসাইজারের প্রভাব তাপমাত্রা ও প্লাস্টিসাইজারের ঘনত্ব—উভয়ের ওপর নির্ভর করে। একটি নির্দিষ্ট ঘনত্বের নিচে, যাকে ক্রসওভার ঘনত্ব বলা হয়, প্লাস্টিসাইজার কোনো উপাদানের গুণাঙ্ক কমাতে পারে। তবে সব ঘনত্বেই উপাদানটির কাচীয় রূপান্তর তাপমাত্রা কমে যায়। ক্রসওভার ঘনত্বের পাশাপাশি একটি ক্রসওভার তাপমাত্রাও রয়েছে। এই তাপমাত্রার নিচে প্লাস্টিসাইজার গুণাঙ্কও বৃদ্ধি করে।

প্লাস্টিসাইজার মূল প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে গেলে নমনীয়তা কমে যায়, ভঙ্গুরতা ও ফাটল দেখা দেয়। কয়েক দশক পুরোনো এই প্লাস্টিকের বাতির তারটি বাঁকালে প্লাস্টিসাইজার হারানোর কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

নির্বাচন

[সম্পাদনা]

গত ৬০ বছরে পলিমারের প্লাস্টিসাইজার হিসেবে উপযোগিতা যাচাইয়ের জন্য ৩০,০০০-এরও বেশি বিভিন্ন পদার্থ পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয় মাত্র অল্পসংখ্যক—প্রায় ৫০টি।[৮]

এস্টার প্লাস্টিসাইজার নির্বাচন করা হয় ব্যয় ও কার্যকারিতার মূল্যায়নের ভিত্তিতে। রাবার যৌগ প্রস্তুতকারককে এস্টার প্লাস্টিসাইজারের সামঞ্জস্য, প্রক্রিয়াযোগ্যতা, স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য কার্যসম্পাদন বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন করতে হয়। বর্তমানে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের এস্টার রাসায়নিকের মধ্যে সেবাকেট, অ্যাডিপেট, টেরেফথালেট, ডিবেনজোয়েট, গ্লুটারেট, ফথালেট, অ্যাজেলেট এবং অন্যান্য বিশেষ মিশ্রণ রয়েছে। এই বিস্তৃত পণ্যসম্ভার টিউব ও হোস, মেঝে, দেয়ালের আবরণ, সিল ও গ্যাসকেট, বেল্ট, তার ও কেবল এবং মুদ্রণ রোলের মতো বিভিন্ন ইলাস্টোমার ব্যবহারে প্রয়োজনীয় নানা ধরনের কার্যকারিতা প্রদান করে।

কম থেকে বেশি মেরুত্বের এস্টার নাইট্রাইল, পলিক্লোরোপ্রিন, ইপিডিএম, ক্লোরিনযুক্ত পলিইথিলিন এবং এপিক্লোরোহাইড্রিনসহ বিভিন্ন ইলাস্টোমারে ব্যবহার করা যায়। প্লাস্টিসাইজার ও ইলাস্টোমারের পারস্পরিক ক্রিয়া দ্রাব্যতা পরামিতি, আণবিক ভর এবং রাসায়নিক গঠনের মতো বিভিন্ন বিষয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নির্দিষ্ট প্রয়োগের জন্য রাবারের মিশ্রণ তৈরি করতে সামঞ্জস্য ও কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।[৯]

পিভিসি ও অন্যান্য প্লাস্টিকে ব্যবহৃত প্লাস্টিসাইজার সাধারণত মাঝারি দৈর্ঘ্যের সরল বা শাখাযুক্ত অ্যালিফ্যাটিক অ্যালকোহলের সঙ্গে পলিকার্বক্সিলিক অ্যাসিডের এস্টার থেকে তৈরি হয়। কম বিষাক্ততা, মূল উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্য, কম উদ্বায়িতা এবং ব্যয়ের মতো বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এসব যৌগ নির্বাচন করা হয়। সরল ও শাখাযুক্ত অ্যালকাইল অ্যালকোহলের ফথালেট এস্টার এসব বৈশিষ্ট্য পূরণ করে এবং বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিসাইজার। অর্থো-ফথালেট এস্টার ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লাস্টিসাইজার হলেও নিয়ন্ত্রক উদ্বেগের কারণে বিশেষ করে ইউরোপে শ্রেণিবদ্ধ পদার্থ থেকে অশ্রেণিবদ্ধ পদার্থের দিকে, যার মধ্যে উচ্চ আণবিক ভরের অর্থো-ফথালেট ও অন্যান্য প্লাস্টিসাইজার রয়েছে, ব্যবহার সরে যাচ্ছে।

অ্যান্টিপ্লাস্টিসাইজার

[সম্পাদনা]

অ্যান্টিপ্লাস্টিসাইজার হলো পলিমার সংযোজক, যেগুলোর প্রভাব প্লাস্টিসাইজারের বিপরীত। এগুলো কাচীয় রূপান্তর তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি গুণাঙ্ক বৃদ্ধি করে।

বিস(২-ইথাইলহেক্সিল) ফথালেট একটি সাধারণ প্লাস্টিসাইজার।

নিরাপত্তা ও বিষাক্ততা

[সম্পাদনা]

কিছু পলিমার প্লাস্টিসাইজারের নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে, কিছু কম আণবিক ভরের অর্থো-ফথালেটকে সম্ভাব্য অন্তঃস্রাব বিঘ্নকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এগুলোর সঙ্গে বিকাশগত বিষক্রিয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।[১০][১১] প্লাস্টিসাইজার পলিমার ম্যাট্রিক্সের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে আবদ্ধ না থাকায় প্লাস্টিকের স্থানান্তর ও ঘর্ষণের মাধ্যমে প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। "নতুন গাড়ির গন্ধ" প্রায়ই প্লাস্টিসাইজার বা এর অবক্ষয়জাত পদার্থের কারণে হয় বলে মনে করা হয়,[১২] তবে গন্ধের উপাদান নিয়ে করা একাধিক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফথালেট পাওয়া যায়নি। এর সম্ভাব্য কারণ হলো ফথালেটের অত্যন্ত কম উদ্বায়িতা ও বাষ্পচাপ।[১৩]

সাধারণ পলিমার প্লাস্টিসাইজার

[সম্পাদনা]

অর্থো ফথালেট

[সম্পাদনা]
  • ভালো পানি ও তেল প্রতিরোধের প্রয়োজন হয় এমন ক্ষেত্রে ফথালেট-ভিত্তিক প্লাস্টিসাইজার ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি সাধারণ ফথালেট প্লাস্টিসাইজার হলো:
  • কম আণবিক ভরের অর্থো ফথালেট
  • উচ্চ আণবিক ভরের অর্থো ফথালেট
    • ডাইআইসোনোনাইল ফথালেট (ডিআইএনপি), মেঝে নির্মাণের উপাদানে ব্যবহৃত হয় এবং বাগানের হোস, জুতা, খেলনা ও নির্মাণসামগ্রীতে পাওয়া যায়
    • বিস(২-প্রোপাইলহেপ্টাইল) ফথালেট (ডিপিএইচপি), কেবল, তার ও ছাদ নির্মাণের উপাদানে ব্যবহৃত হয়
    • ডাইআইসোডেসাইল ফথালেট (ডিআইডিপি), তার ও কেবলের নিরোধক, গাড়ির নিচের আবরণ, জুতা, কার্পেট ও সুইমিং পুলের আবরণে ব্যবহৃত হয়
    • ডাইআইসাউন্ডেসাইল ফথালেট (ডিআইইউপি), তার ও কেবলের নিরোধক, গাড়ির নিচের আবরণ, জুতা, কার্পেট ও সুইমিং পুলের আবরণে ব্যবহৃত হয়। উচ্চ তাপমাত্রা ও বাইরের আবহাওয়ার প্রভাবে এর কার্যকারিতা ভালো
    • ডাইট্রাইডেসাইল ফথালেট (ডিটিডিপি) হলো সর্বোচ্চ আণবিক ভরের ফথালেট প্লাস্টিসাইজার, যা উচ্চ তাপমাত্রায় উন্নত কার্যকারিতা প্রদান করে। মোটরযানের কেবল ও তারের কাজে এটি পছন্দের প্লাস্টিসাইজার।

টেরেফথালেট

[সম্পাদনা]
  • টেরেফথালেট অর্থো ফথালেটের সমাণু, তবে জলবিশ্লেষণ ও বিপাকীয় ভাঙনের সময় স্থিতিশীল মনোএস্টার তৈরি করতে না পারায় বিষবিদ্যাগত পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পাওয়া গেছে।
    • বিস(২-ইথাইলহেক্সিল) টেরেফথালেট (ডিইএইচটি; ডাইঅক্টাইল টেরেফথালেট, ডটিপি) (ইস্টম্যান কেমিক্যাল কোম্পানির বাণিজ্যিক নাম: ইস্টম্যান ১৬৮™), ডিইএইচপি ও ডিআইএনপির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়
    • ডাইআইসোপেন্টাইল টেরেফথালেট (ডিআইপিটি) (ইভোনিক ইন্ডাস্ট্রিজের বাণিজ্যিক নাম: ইলাটুর® ডিপিটি), ডিবিপি ও ডিআইবিপির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়
    • ডাইবিউটাইল টেরেফথালেট (ডিবিটি) (ইস্টম্যান কেমিক্যালের বাণিজ্যিক নাম: ইস্টম্যান ইফিউশন™), ডিবিপি ও ডিআইবিপির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়

ট্রাইমেলিটেট

[সম্পাদনা]

অ্যাডিপেট ও সেবাকেট

[সম্পাদনা]

অর্গানোফসফেট

[সম্পাদনা]

অন্যান্য

[সম্পাদনা]
  • ১,২-সাইক্লোহেক্সেন ডিকার্বক্সিলিক অ্যাসিড ডাইআইসোনোনাইল এস্টার (বিএএসএফের বাণিজ্যিক নাম: হেক্সামল ডিআইএনসিএইচ)
  • বিস(২-ইথাইলহেক্সিল) সাইক্লোহেক্সেন-১,৪-ডিকার্বক্সিলেট (হানওয়া-এর বাণিজ্যিক নাম: ইকো-ডিইএইচসিএইচ)
  • অ্যালকাইল সালফোনিক অ্যাসিড ফেনাইল এস্টার (এএসই)। (ল্যানক্সেস কেমিক্যালের বাণিজ্যিক নাম: মেসামল)
  • ট্রাইইথিলিন গ্লাইকল ডাই-২-ইথাইলহেক্সানোয়েট (ইস্টম্যান কেমিক্যালের বাণিজ্যিক নাম: ইস্টম্যান টিইজি-ইএইচ)

জৈবভিত্তিক প্লাস্টিসাইজার, যেমন গ্লিসারল ট্রাইঅ্যাসিটেট (ট্রাইঅ্যাসিটিন) এবং অ্যাসিটাইলট্রাইবিউটাইলসিট্রেট, নিয়েও গবেষণা হয়েছে। এগুলো বিশেষায়িত কাজে ব্যবহৃত হয়। এপক্সিডাইজড সয়াবিন তেল বিভিন্ন ভিনাইল পণ্যে গৌণ প্লাস্টিসাইজার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

  • উল্লেখ্য: বিসফেনল এ, বা বিপিএ, প্লাস্টিসাইজার নয়,[১৭] যদিও এটিকে প্রায়ই ভুলভাবে প্লাস্টিসাইজার হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

অজৈব উপাদানের জন্য

[সম্পাদনা]

কংক্রিট

[সম্পাদনা]

কংক্রিট প্রযুক্তিতে প্লাস্টিসাইজারকে সাধারণত পানি হ্রাসকারী এবং অতিপ্লাস্টিসাইজারকে উচ্চমাত্রার পানি হ্রাসকারী হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্লাস্টিসাইজার সাধারণত প্রায় ৫–১২ শতাংশ পানি কমাতে পারে, যেখানে অতিপ্লাস্টিসাইজার সংযোজকের ধরন ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে ১২ শতাংশের বেশি এবং প্রায়ই ২০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত পানি কমাতে পারে।[১৮] এএসটিএম সি৪৯৪ অনুযায়ী, প্রচলিত পানি হ্রাসকারী সংযোজক সাধারণত টাইপ এ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়, আর উচ্চমাত্রার পানি হ্রাসকারী সংযোজককে বিলম্বকারী বৈশিষ্ট্যও থাকলে টাইপ এফ বা টাইপ জি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।[১৯] মাঝারি মাত্রায় কার্যোপযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে প্রধানত প্লাস্টিসাইজার ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, কম পানি-সিমেন্ট অনুপাত ও বেশি প্রবাহযোগ্যতা প্রয়োজন এমন কাজে অতিপ্লাস্টিসাইজার ব্যবহৃত হয়। কংক্রিটের মিশ্রণে এগুলো যোগ করলে কার্যোপযোগিতা ও শক্তিসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উন্নতি ঘটে। কংক্রিটের শক্তি যোগ করা পানির পরিমাণের সঙ্গে বিপরীতভাবে সম্পর্কিত; অর্থাৎ পানি-সিমেন্ট অনুপাত যত কম, কংক্রিট তত শক্ত হয়।[১৮] শক্তিশালী কংক্রিট তৈরির জন্য কম পানি যোগ করা হয়, তবে মিশ্রণকে পর্যাপ্তভাবে ভেজা রাখতে হয়। এতে কংক্রিটের মিশ্রণ কম কার্যোপযোগী ও মেশানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং তখন প্লাস্টিসাইজার, পানি হ্রাসকারী, অতিপ্লাস্টিসাইজার, তরলীকরণকারী বা বিচ্ছুরকের প্রয়োজন হয়।[২০]

শক্তি বৃদ্ধির জন্য কংক্রিটে পোজোলানিক ছাই যোগ করা হলে প্লাস্টিসাইজারও প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। উচ্চ-শক্তির কংক্রিট ও তন্তু-শক্তিবর্ধিত কংক্রিট তৈরির সময় মিশ্রণের অনুপাত নির্ধারণের এই পদ্ধতি বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

সিমেন্টের একক ভরের বিপরীতে সাধারণত ১–২ শতাংশ প্লাস্টিসাইজার যোগ করাই যথেষ্ট। কিছু ক্ষেত্রে প্লাস্টিসাইজার যোগ করলে দৃঢ়ীভবন বিলম্বিত হয়।

প্লাস্টিসাইজার সাধারণত লিগনোসালফোনেট থেকে তৈরি হয়, যা কাগজ শিল্পের উপজাত। অতিপ্লাস্টিসাইজার সাধারণত সালফোনিত ন্যাফথালিন ঘনীভূত পদার্থ অথবা সালফোনিত মেলামিন ফরমালডিহাইড থেকে তৈরি করা হতো, যদিও বর্তমানে পলিকার্বক্সিলিক ইথার-ভিত্তিক নতুন পণ্যও পাওয়া যায়। প্রচলিত লিগনোসালফোনেট-ভিত্তিক প্লাস্টিসাইজার এবং ন্যাফথালিন ও মেলামিন সালফোনেট-ভিত্তিক অতিপ্লাস্টিসাইজার তড়িৎস্থির বিকর্ষণের মাধ্যমে জমাটবদ্ধ সিমেন্ট কণাকে বিচ্ছুরিত করে (দেখুন কলয়েড)। সাধারণ প্লাস্টিসাইজারে সক্রিয় পদার্থগুলো সিমেন্ট কণার পৃষ্ঠে অধিশোষিত হয়ে কণাগুলোকে ঋণাত্মক আধান দেয়, ফলে তাদের মধ্যে বিকর্ষণ সৃষ্টি হয়। লিগনিন, ন্যাফথালিন ও মেলামিন সালফোনেট অতিপ্লাস্টিসাইজার জৈব পলিমার। এদের দীর্ঘ অণুগুলো সিমেন্ট কণাকে ঘিরে ফেলে এবং কণাগুলোকে প্রবল ঋণাত্মক আধান দেয়, ফলে তারা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে।

পলিকার্বক্সিলেট ইথার অতিপ্লাস্টিসাইজার বা পলিকার্বক্সিলেট সালফোনেট-ভিত্তিক অতিপ্লাস্টিসাইজারের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে। এটি স্টেরিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে সিমেন্টকে বিচ্ছুরিত করে। এই ধরনের বিচ্ছুরণের প্রভাব বেশি শক্তিশালী এবং সিমেন্টজাত মিশ্রণের কার্যোপযোগিতা দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সহায়তা করে।[২১]

স্টুকো

[সম্পাদনা]

কার্যোপযোগিতা বাড়ানোর জন্য ওয়ালবোর্ড স্টুকোর মিশ্রণে প্লাস্টিসাইজার যোগ করা যায়। ওয়ালবোর্ড শুকানোর সময় ব্যবহৃত শক্তি কমানোর জন্য কম পানি যোগ করা হয়। এতে জিপসামের মিশ্রণ অত্যন্ত কম কার্যোপযোগী ও মেশানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং প্লাস্টিসাইজার, পানি হ্রাসকারী বা বিচ্ছুরকের প্রয়োজন হয়। কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত লিগনোসালফোনেট বিচ্ছুরক দৃঢ়ীভবন বিলম্বিত করতে পারে। তথ্য থেকে দেখা যায়, নিরাকার স্ফটিক গঠন তৈরি হয়, যা মূল অংশে সূচের মতো স্ফটিকগুলোর পারস্পরিক যান্ত্রিক সংযোগকে দুর্বল করে এবং ফলে মূল অংশটি শক্তিশালী হতে পারে না। লিগনোসালফোনেটের অ্যালডোনিক অ্যাসিডের মতো শর্করা ও কিলেটকারী পদার্থ এবং নিষ্কাশিত যৌগগুলোই মূলত দৃঢ়ীভবন বিলম্বের জন্য দায়ী। এসব নিম্নমাত্রার পানি হ্রাসকারী বিচ্ছুরক সাধারণত লিগনোসালফোনেট থেকে তৈরি হয়, যা কাগজ শিল্পের একটি উপজাত।

উচ্চমাত্রার অতিপ্লাস্টিসাইজার বা বিচ্ছুরক সাধারণত সালফোনিত ন্যাফথালিন ঘনীভূত পদার্থ থেকে তৈরি হয়, যদিও পলিকার্বক্সিলিক ইথার আরও আধুনিক বিকল্প। এই দুই ধরনের উচ্চমাত্রার পানি হ্রাসকারী সাধারণত লিগনোসালফোনেট-জাত প্লাস্টিসাইজারের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক মাত্রায় ব্যবহার করা হয়।[২২]

প্রচলিত লিগনোসালফোনেট ও ন্যাফথালিন সালফোনেট-ভিত্তিক প্লাস্টিসাইজার তড়িৎস্থির বিকর্ষণের মাধ্যমে জমাটবদ্ধ জিপসাম কণাকে বিচ্ছুরিত করে (দেখুন কলয়েড)। সাধারণ প্লাস্টিসাইজারে সক্রিয় পদার্থগুলো জিপসাম কণার পৃষ্ঠে অধিশোষিত হয়ে কণাগুলোকে ঋণাত্মক আধান দেয়, ফলে তাদের মধ্যে বিকর্ষণ সৃষ্টি হয়। লিগনিন ও ন্যাফথালিন সালফোনেট প্লাস্টিসাইজার জৈব পলিমার। তাদের দীর্ঘ অণুগুলো জিপসাম কণাকে ঘিরে ফেলে এবং কণাগুলোকে প্রবল ঋণাত্মক আধান দেয়, ফলে তারা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে।[২৩]

শক্তিবর্ধক উপাদান

[সম্পাদনা]

শক্তিবর্ধক উপাদানের আতশবাজির মিশ্রণে, বিশেষত কঠিন রকেট প্রপেল্যান্ট ও বন্দুকের ধোঁয়াবিহীন বারুদে, প্রপেল্যান্টের বাইন্ডার বা সামগ্রিক প্রপেল্যান্টের ভৌত বৈশিষ্ট্য উন্নত করতে, গৌণ জ্বালানি সরবরাহ করতে এবং আদর্শভাবে প্রপেল্যান্টের নির্দিষ্ট শক্তি উৎপাদন বাড়াতে প্লাস্টিসাইজার প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। শক্তিবর্ধক প্লাস্টিসাইজার শক্তিবর্ধক উপাদানের ভৌত বৈশিষ্ট্য উন্নত করার পাশাপাশি এর নির্দিষ্ট শক্তি উৎপাদনও বাড়ায়। কঠিন রকেট প্রপেল্যান্টের ক্ষেত্রে শক্তিবর্ধক প্লাস্টিসাইজার সাধারণত অশক্তিবর্ধক প্লাস্টিসাইজারের চেয়ে বেশি পছন্দনীয়। শক্তিবর্ধক প্লাস্টিসাইজার প্রয়োজনীয় প্রপেল্যান্টের ভর কমায়, ফলে রকেটযান অন্যথায় যতটা পারত তার চেয়ে বেশি পেলোড বহন করতে বা বেশি বেগে চলতে পারে। তবে নিরাপত্তা বা ব্যয়ের বিবেচনায় কখনও কখনও রকেট প্রপেল্যান্টেও অশক্তিবর্ধক প্লাস্টিসাইজার ব্যবহার করতে হয়। স্পেস শাটলের কঠিন রকেট বুস্টার চালাতে ব্যবহৃত কঠিন রকেট প্রপেল্যান্টে এইচটিপিবি, একটি কৃত্রিম রাবার, অশক্তিবর্ধক গৌণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শক্তিবর্ধক উপাদানের জন্য প্লাস্টিসাইজার

[সম্পাদনা]

রকেট প্রপেল্যান্ট ও ধোঁয়াবিহীন বারুদে ব্যবহৃত কয়েকটি শক্তিবর্ধক প্লাস্টিসাইজার হলো:

গৌণ অ্যালকোহল গোষ্ঠীর কারণে এনজি ও বিটিটিএনের তাপীয় স্থিতিশীলতা তুলনামূলকভাবে কম। টিএমইটিএন, ডিইজিডিএন, বিডিএনপিএফ ও বিডিএনপিএ-এর শক্তি তুলনামূলকভাবে কম। এনজি ও ডিইজিডিএনের বাষ্পচাপ তুলনামূলকভাবে বেশি।[২৪]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 Allsopp, M. W.; Vianello, G. (২০১২)। "Poly(Vinyl Chloride)"। উলম্যানস এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিস্ট্রি। ওয়েইনহেইম: উইলি-ভিসিএইচ। ডিওআই:10.1002/14356007.a21_717। {{বিশ্বকোষ উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতিতে খালি অজানা প্যারামিটার রয়েছে: |authors= (সাহায্য)
  2. ↑ "Types of Superplasticizers"। Reduction।
  3. ↑ David F. Cadogan and Christopher J. Howick "Plasticizers" in Ullmann's Encyclopedia of Industrial Chemistry 2000, Wiley-VCH, Weinheim. ডিওআই:10.1002/14356007.a20_439
  4. ↑ (1) Maeda, Y.; Paul, D. R. J. Polym. Sci. Part B Polym. Phys. 1987, 25, 957–980.
  5. ↑ (1) Maeda, Y.; Paul, D. R. J. Polym. Sci. Part B Polym. Phys. 1987, 25, 1005–1016.
  6. ↑ (1) Casalini, R.; Ngai, K. L.; Robertson, C. G.; Roland, C. M. J. Polym. Sci. Part B Polym. Phys. 2000, 38, 1841–1847.
  7. ↑ Capponi, S.; Alvarez, F.; Racko, D. (২০২০), "Free Volume in a PVME Polymer–Water Solution", Macromolecules, ৫৩ (12): ৪৭৭০–৪৭৮২, বিবকোড:2020MaMol..53.4770C, ডিওআই:10.1021/acs.macromol.0c00472, এইচডিএল:10261/218380, এস২সিআইডি 219911779
  8. ↑ Malveda, Michael P (জুলাই ২০১৫)। "Chemical Economics Handbook Report on Plasticizers"। {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য |journal= প্রয়োজন (সাহায্য)
  9. ↑ ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত মার্চ ২৭, ২০০৯ তারিখে
  10. ↑ Halden, Rolf U. (২০১০)। "Plastics and Health Risks"। Annual Review of Public Health। ৩১: ১৭৯–১৯৪। ডিওআই:10.1146/annurev.publhealth.012809.103714। পিএমআইডি 20070188।
  11. ↑ Eales, J.; Bethel, A.; Galloway, T.; Hopkinson, P.; Morrissey, K.; Short, R. E.; Garside, R. (১ জানুয়ারি ২০২২)। "Human health impacts of exposure to phthalate plasticizers: An overview of reviews"। Environment International। ১৫৮ 106903। ডিওআই:10.1016/j.envint.2021.106903। এইচডিএল:10871/128987। আইএসএসএন 0160-4120।
  12. ↑ Geiss, O.; Tirendi, S.; Barrero-Moreno, J.; Kotzias, D., "Investigation of volatile organic compounds and phthalates present in the cabin air of used private cars", Environment International 2009, 35, 1188–1195. ডিওআই:10.1016/j.envint.2009.07.016
  13. ↑ Chemical and Engineering News, 2002, 80(20), 45; http://pubs.acs.org/cen/whatstuff/stuff/8020stuff.html
  14. ↑ DEHP (plasticizer)
  15. ↑ TOTM as plasticizer
  16. ↑ DEHS (plasticizer)
  17. ↑ Cadogan DF, Howick CJ (২০০০)। "Plasticizers"। Ullmann's Encyclopedia of Industrial Chemistry। ডিওআই:10.1002/14356007.a20_439। আইএসবিএন ৩-৫২৭-৩০৬৭৩-০।
  18. 1 2 Blask, Oliver; John, Elisabeth; Stephan, Dietmar (২০২১)। "Construction Chemistry"। Ullmann's Encyclopedia of Industrial Chemistry। পৃ. ১–৮০। ডিওআই:10.1002/14356007.w07_w01। আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৫২৭-৩০৩৮৫-৪।
  19. ↑ Annual Book of ASTM Standards: ASTM C494/C494M – Standard Specification for Chemical Admixtures for Concrete। ASTM International। ২০২৩।
  20. ↑ Cement Admixture Association। "CAA"। www.admixtures.org.uk। ১৬ মার্চ ২০০৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ এপ্রিল ২০০৮।
  21. ↑ C&EN: Coverstory - Synthetic Chemistry Moves Into Concrete
  22. ↑ ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত জুলাই ২৪, ২০১১ তারিখে
  23. ↑ Kirby, Glen H.; Jennifer A. Lewis (২০০২)। "Rheological property evolution in concentrated cement-polyelectrolyte suspensions"। Journal of the American Ceramic Society। ৮৫ (12): ২৯৮৯–২৯৯৪। ডিওআই:10.1111/j.1151-2916.2002.tb00568.x।
  24. ↑ 2,2,2-trinitroethyl 2-nitroxyethyl ether and a method of preparation - US Patent 4745208

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]