বিষয়বস্তুতে চলুন

আটলান্টিকের যুদ্ধ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
আটলান্টিকের যুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ

১৯৪১ সালের অক্টোবর মাসে একটি ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার জাহাজের ব্রিজের ওপর থেকে কর্মকর্তারা শত্রুপক্ষের সাবমেরিনের খোঁজে নজরদারি করছেন।
তারিখ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ থেকে ৮ মে ১৯৪৫।
(৫ বছর, ৮ মাস ও ৫ দিন)
অবস্থান
ফলাফল মিত্রশক্তির বিজয়
বিবাদমান পক্ষ
সেনাধিপতি ও নেতৃত্ব প্রদানকারী
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
  • ৩৬,২০০ জন নিহত (নৌবাহিনী)[৫][৬]
  • ৩৬,০০০ জন নিহত (মার্চেন্ট নেভি)[৫][৬]
  • ৩,৫০০ মার্চেন্ট জাহাজ হারিয়েছে
  • ১৭৫ যুদ্ধজাহাজ হারিয়েছে
  • ৭৪১ আরএএফ কোস্টাল কমান্ড বিমান সাবমেরিন বিরোধী অভিযানে হারিয়েছে[৭]

আটলান্টিকের যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন সামরিক অভিযান[১০][১১], ১৯৩৯ সালে শুরু হয়ে ১৯৪৫ সালে নাৎসি জার্মানির পরাজয় পর্যন্ত চলে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নৌ-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর কেন্দ্রে ছিল জার্মানির বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির নৌ-অবরোধ, যা যুদ্ধ ঘোষণার পরদিনই শুরু হয়, এবং জার্মানির পাল্টা-অবরোধ। এই অভিযান ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৪৩ সালের শেষ পর্যন্ত তুঙ্গে ছিল।

এই যুদ্ধে জার্মান ক্রিগসমারিনের (নৌবাহিনী) ইউ-বোট ও অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ এবং লুফটওয়াফের (বিমানবাহিনী) বিমান মুখোমুখি হয় রয়্যাল নেভি, রয়্যাল কানাডিয়ান নৌবাহিনী, মার্কিন নৌবাহিনী এবং মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক জাহাজের বিরুদ্ধে। উত্তর আমেরিকা থেকে আসা কনভয়গুলো, যা মূলত যুক্তরাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্দেশে যাত্রা করত, ব্রিটিশ ও কানাডিয়ান নৌ ও বিমানবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। ১৯৪১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন জাহাজ ও বিমানও এতে সহায়তা শুরু করে।[১২] জার্মানির অক্ষ মিত্র ইতালি ১৯৪০ সালের ১০ জুন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর তাদের রেজিয়া মারিনার (রাজকীয় নৌবাহিনী) সাবমেরিনগুলোও জার্মানদের সাথে যোগ দেয়।

দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় যুক্তরাজ্য আমদানি পণ্যের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিল। যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রতি সপ্তাহে দশ লক্ষ টনেরও বেশি আমদানি পণ্য প্রয়োজন হতো। আটলান্টিকের যুদ্ধ ছিল একটি টনেজ যুদ্ধ: মিত্রশক্তি ব্রিটেনে রসদ পৌঁছানোর জন্য সংগ্রাম করত, আর অক্ষশক্তি ব্রিটেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টার জন্য অপরিহার্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করত। যুক্তরাজ্যে রেশনিং চালু করা হয় অপচয় কমাতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে এবং বণ্টনে সমতা আনতে। ১৯৪২ সাল থেকে অক্ষশক্তি অধিকৃত ইউরোপে আক্রমণের প্রস্তুতির জন্য যুক্তরাজ্যে মিত্রশক্তির সরবরাহ ও সরঞ্জাম জমা হওয়া রোধ করার চেষ্টা করে। পশ্চিম ইউরোপে অক্ষশক্তিকে পিছু হটাতে ইউ-বোটের হুমকি দমন করা ছিল অপরিহার্য। ফলাফল ছিল মিত্রশক্তির কৌশলগত বিজয়—জার্মানির টনেজ যুদ্ধ ব্যর্থ হয়—কিন্তু এর জন্য বিপুল মূল্য দিতে হয়: আটলান্টিকে ৩,৫০০ বাণিজ্যিক জাহাজ ও ১৭৫ যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়, যার বিনিময়ে ৭৮৩ ইউ-বোট ও ৪৭টি জার্মান ভাসমান যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়, যার মধ্যে ছিল ৪টি যুদ্ধজাহাজ (বিসমার্ক, শার্নহর্স্ট, নাইসেনাউ, টিরপিটজ), ৯টি ক্রুজার, ৭টি রেইডার এবং ২৭টি ডেস্ট্রয়ার। এই সামদ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রটি জার্মানির যুদ্ধ প্রচেষ্টার একটি বড় অংশ গ্রাস করে ফেলে: জার্মানি ট্যাঙ্কসহ স্থলভাগের সব যানবাহনের চেয়ে বেশি অর্থ নৌযান তৈরিতে ব্যয় করেছিল।[১৩]

আটলান্টিকের যুদ্ধকে ইতিহাসের দীর্ঘতম, বৃহত্তম ও সবচেয়ে জটিল নৌ-যুদ্ধ বলা হয়। ইউরোপে যুদ্ধ শুরুর পরপরই, ফোনি যুদ্ধের সময় থেকে শুরু হয়ে এটি ১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মানির আত্মসমর্পণ পর্যন্ত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। লক্ষ লক্ষ বর্গমাইল সমুদ্র এলাকায় হাজার হাজার জাহাজ এই অভিযানে অংশ নেয়। পরিস্থিতি ক্রমাগত পরিবর্তিত হতো। নতুন দেশ যুদ্ধে যোগ দেওয়ায়, আত্মসমর্পণ করায় বা পক্ষ পরিবর্তন করায় এবং নতুন অস্ত্র, কৌশল ও সরঞ্জাম উদ্ভাবিত হওয়ায় কোনো না কোনো পক্ষ সুবিধা পেত। মিত্রশক্তি ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তার করে, ১৯৪২ সালের শেষে জার্মান ভাসমান রেইডার এবং ১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি ইউ-বোটগুলোকে পরাজিত করে, যদিও ইউ-বোটের কারণে ক্ষয়ক্ষতি যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল পরে লেখেন, "যুদ্ধের সময় একমাত্র ইউ-বোটের বিপদই আমাকে সত্যিকারের ভয় পাইয়েছিল। ব্রিটেনের যুদ্ধের গৌরবময় বিমান যুদ্ধের চেয়েও আমি এই যুদ্ধ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলাম।"[১৪]

নামকরণ

[সম্পাদনা]

১৯৪১ সালের ৫ই মার্চ, ফার্স্ট লর্ড অফ দি অ্যাডমিরালটি (নৌ-দপ্তরের প্রধান), এ. ভি. আলেকজান্ডার, 'আটলান্টিকের যুদ্ধ' লড়ার জন্য সংসদের কাছে 'আরও অনেক জাহাজ এবং বিপুল সংখ্যক লোকবল' চেয়ে আবেদন করেন। তিনি এই যুদ্ধকে আগের গ্রীষ্মে সংঘটিত 'ব্যাটল অফ ফ্রান্স' বা ফ্রান্সের যুদ্ধের সাথে তুলনা করেন। ১৯শে মার্চ মন্ত্রিসভায় 'আটলান্টিকের যুদ্ধ কমটি'-র প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। উইনস্টন চার্চিল দাবি করেন যে, আলেকজান্ডারের ভাষণের ঠিক আগেই তিনিই 'ব্যাটল অফ দি আটলান্টিক' নামটি উদ্ভাবন করেছিলেন, কিন্তু এর আগেও এই নামটি ব্যবহারের বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির অবাধ সাবমেরিন যুদ্ধের ব্যবহারের পর, বিভিন্ন দেশ সাবমেরিন নিষিদ্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরিবর্তে, লন্ডন নৌ-চুক্তির মাধ্যমে সাবমেরিনগুলোকে "ক্রুজার নিয়ম" মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, সাবমেরিনকে জাহাজ ডুবানোর আগে পানির উপরে ভেসে উঠতে হবে, জাহাজে তল্লাশি চালাতে হবে এবং জাহাজের ক্রুদের "নিরাপদ স্থানে" সরিয়ে নিতে হবে। তবে, লাইফবোটকে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া নিরাপদ স্থান হিসেবে গণ্য করা হতো না। এই নিয়ম জাহাজের ক্রুদের থামতে অস্বীকৃতি বা তল্লাশি ও পরিদর্শনের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ দেখালে জাহাজ ডুবানোর অনুমতি দিত। এই নিয়মগুলো বণিক জাহাজে অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করেনি, তবে অস্ত্র বহন বা সাবমেরিন (বা আক্রমণকারী জাহাজ) সম্পর্কে রিপোর্ট করলে সেগুলোকে ডি ফ্যাক্টো নৌ-সহায়ক জাহাজ হিসেবে গণ্য করা হতো এবং ক্রুজার নিয়মের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হতো।

ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিকে ইউ-বোট (সাবমেরিন) পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের নৌবহরকে কয়েকটি অপ্রচলিত জাহাজে সীমাবদ্ধ করা হয়। যখন এই অপ্রচলিত জাহাজগুলোর মধ্যে তিনটি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, জার্মানরা ডয়চল্যান্ড-শ্রেণির প্যানজারশিফে (সাঁজোয়া জাহাজ) নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়, যেগুলো বিদেশী নৌবাহিনীতে "পকেট ব্যাটলশিপ" নামে পরিচিত ছিল। এই জাহাজগুলো দূরবর্তী সমুদ্রে বাণিজ্য আক্রমণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে স্বাধীনভাবে চলমান জাহাজগুলোকে শিকার করা যায় এবং শক্তিশালী শত্রু বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানো যায়।

১৯৩৫ সালের অ্যাংলো-জার্মান নৌ-চুক্তি হিটলারকে ভার্সাই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার এবং ব্রিটেনের নৌবহরের ৩৫% আকারের একটি বহর গড়ে তোলার অনুমতি দেয়। এই চুক্তির পরপরই চারটি যুদ্ধজাহাজ, দুটি বিমানবাহী জাহাজ, পাঁচটি ভারী ক্রুজার, ডেস্ট্রয়ার এবং ইউ-বোট নির্মাণের একটি কর্মসূচি শুরু হয়। এই সময়ে হিটলার মনে করতেন যে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে, এই বহরটি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বাণিজ্য আক্রমণের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নয়। তবে, জার্মান ইউ-বোট বাহিনীর কমান্ডার কার্ল ডোনিৎজের ভিন্ন মত ছিল। হিটলার এবং জার্মান নৌবাহিনীর প্রধান এরিখ রেডারের বিপরীতে, তিনি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধকে অনিবার্য মনে করতেন এবং বৃহৎ নৌ-জাহাজের বহরের প্রয়োজন নেই বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, ইউ-বোট দিয়েই ব্রিটেনকে পরাজিত করা সম্ভব। তার হিসাব অনুযায়ী, ৩০০টি মাঝারি ধরনের টাইপ সেভেন ইউ-বোটের একটি বহর প্রতি মাসে ১০ লাখ টন জাহাজ ডুবিয়ে এক বছরের মধ্যে ব্রিটেনের প্রায় ৩,০০০ বণিক জাহাজের (মোট ১৭.৫ মিলিয়ন টন) যথেষ্ট পরিমাণ ডুবিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করতে পারবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইউ-বোটগুলো প্রধানত কনভয় ব্যবস্থার কারণে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু ডোনিৎজ বিশ্বাস করতেন যে রুডেলটাকটিক (রুডেলটাকটিক বা 'উলফপ্যাক' ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত একটি কনভয় (জাহাজবহর) আক্রমণের কৌশল। এটি মূলত আটলান্টিকের যুদ্ধে জার্মান নৌবাহিনীর (Kriegsmarine) ইউ-বোট এবং প্রশান্ত মহাসাগরের যুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন দ্বারা ব্যবহৃত হতো।) দিয়ে এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এই কৌশলে, ইউ-বোটের একটি টহল রেখা কনভয় খুঁজে বের করবে এবং রাতে একসঙ্গে পানির উপর থেকে আক্রমণ করবে। সে সময়ে বিমান বা প্রাথমিক ধরনের সোনার (ব্রিটিশরা যাকে এএসডিআইসি বলত) গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতো না। এএসডিআইসি পানির উপরে থাকা সাবমেরিন শনাক্ত করতে পারত না, এর পরিসর বৈদ্যুতিক টর্পেডোর তুলনায় কম ছিল, বিমান রাতে কাজ করতে পারত না এবং দিনের বেলায় একটি সতর্ক ইউ-বোট আক্রমণের আগেই ডুব দিতে পারত। তবে, ডোনিৎজ রেডারকে তার মতামত বোঝাতে ব্যর্থ হন। ফলে, প্রতিবার ইউ-বোট বহর বাড়ানোর সময়, রেডার উপকূলীয়, মাঝারি এবং বড় ধরনের সাবমেরিন, এমনকি মাইনলেয়ার এবং ইউ-ক্রুজারের মিশ্রণ নির্মাণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। এমনকি ১৯৩৮ সালে যখন হিটলার বুঝতে পারেন যে তাকে শীঘ্রই বা পরে যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে যেতে হবে এবং প্ল্যান জেড চালু করেন, তখনও পরিকল্পিত ২৩৯টি ইউ-বোটের মধ্যে সংখ্যালঘু ছিল মাঝারি ধরনের ইউ-বোট।[১৫]

ডুবোজাহাজ-বিরোধী যুদ্ধ

[সম্পাদনা]

এএসডিআইসি (ASDIC) প্রযুক্তির প্রবর্তনের পর ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ডুবোজাহাজের হুমকি কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করা গেছে। এর ফলে ধ্বংসকারী জাহাজ (ডেস্ট্রয়ার) ও কনভয় রক্ষাকারী জাহাজের (কনভয় এসকর্ট) সংখ্যা কমানো হয় এবং ডুবোজাহাজ-বিরোধী শাখাকে তৃতীয় শ্রেণির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধ্বংসকারী জাহাজগুলোতেও এএসডিআইসি সংযোজন করা হয়েছিল, কিন্তু ধারণা করা হয়েছিল যে এগুলো নৌবহরের যুদ্ধে ব্যবহৃত হবে—ডুবোজাহাজ-বিরোধী অভিযানে নয়। ফলে এএসডিআইসি ব্যবহারে তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।[ঙ][১৬]

একটি কনভয় এসকর্টের একজন প্রহরী ডেপথ চার্জ থ্রোয়ারের উপর বাইনোকুলার রেখে পোজ দিচ্ছেন; এই থ্রোয়ার ব্যবহার করে এসকর্টের দু'পাশে ডেপথ চার্জ নিক্ষেপ করা হতো।

এএসডিআইসির পরীক্ষাগুলো সাধারণত আদর্শ পরিস্থিতিতে পরিচালিত হতো, এবং অ্যাডমিরালটি এর সীমাবদ্ধতাগুলো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। এর কার্যকরী পরিসর ছিল সংকীর্ণ; আট নটের বেশি গতিতে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ত, প্রতিকূল আবহাওয়ায় ব্যাহত হতো এবং থার্মোক্লাইন, তিমি, মাছের ঝাঁক বা জাহাজের ধ্বংসাবশেষের প্রতিধ্বনি শনাক্ত করতে অত্যন্ত দক্ষ অপারেটরের প্রয়োজন হতো। প্রাথমিক সংস্করণগুলো সরাসরি নিচের দিকে স্ক্যান করতে পারত না, তাই গভীরতা চার্জ (ডেপথ চার্জ) হামলার চূড়ান্ত পর্যায়ে লক্ষ্যের সংস্পর্শ হারিয়ে যেত। প্রাথমিক সেট দূরত্ব ও দিকনির্দেশ শনাক্ত করতে পারলেও লক্ষ্যের গভীরতা কেবল সংস্পর্শ হারানোর দূরত্ব থেকে অনুমান করা যেত।

একটি রক্ষাকারী জাহাজ তার এএসডিআইসি রশ্মি নিজ গতিপথের এক পাশ থেকে অন্য পাশে চাপের মতো ঘুরিয়ে স্ক্যান করত, প্রতি কয়েক ডিগ্রি অন্তর ট্রান্সডিউসার থামিয়ে সংকেত পাঠাতো। ডুবোজাহাজ শনাক্ত হলে জাহাজটি মাঝারি গতিতে এগিয়ে যেত এবং আক্রমণের সময় গতি বাড়াতো। উদ্দেশ্য ছিল ডুবোজাহাজের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় পিছনের চুট (chutes) থেকে গভীরতা চার্জ গড়িয়ে দেওয়া, পাশাপাশি নিক্ষেপকারী যন্ত্র (throwers) দ্বারা উভয় পাশে অতিরিক্ত চার্জ নিক্ষেপ করে একটি প্যাটার্ন তৈরি করা। ডুবোজাহাজ নিষ্ক্রিয় করতে চার্জটিকে তার ২০ ফুট (৬.১ মিটার) মধ্যে বিস্ফোরিত হতে হতো। প্রাথমিক এএসডিআইসি সরঞ্জাম গভীরতা নির্ণয়ে দুর্বল হওয়ায় প্যাটার্নের অংশবিশেষে গভীরতার সেটিং পরিবর্তন করা হতো।

১৯৩৯ সালের শুরুতে যুদ্ধের হুমকি ঘনিয়ে এলে ব্রিটেন বুঝতে পারে যে লন্ডন নৌ-চুক্তির ওপর ভরসা করা যাবে না—যা অবাধ ডুবোজাহাজ যুদ্ধ নিষিদ্ধ করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কনভয় ব্যবস্থার সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রাখা হয়েছিল এবং ১৯৩০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে এটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আধুনিকীকরণ করা হয়। কিন্তু কনভয় রক্ষায় পর্যাপ্ত জাহাজের অভাব ছিল। তাই দ্রুততার সাথে ট্রি-ক্লাস ট্রলার, ফ্লাওয়ার-ক্লাস কর্ভেট এবং হান্ট-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার তৈরির একটি কর্মসূচি শুরু করা হয়। যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কনভয়ের জন্য খুব দ্রুত বা খুব ধীর ছিল, সেগুলোকে পানির উপরিভাগে ডুবোজাহাজের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক দিয়ে সজ্জিত করা হয়। এর ফলে আক্রমণকারী ইউ-বোটকে তার মূল্যবান টর্পেডো ব্যয় করতে বাধ্য হতো এবং এই জাহাজগুলো "প্রাইজ ল" (prize law)-এর অধীনে ক্রুজার বিধির সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হতো।[১৭]

এই অপ্রস্তুত অবস্থা সত্ত্বেও ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির কাছে বিশ্বের অন্যান্য সব নৌবাহিনীর সম্মিলিত এএসডিআইসি-সজ্জিত যুদ্ধজাহাজের সমপরিমাণ জাহাজ ছিল।[১৮]

একইভাবে বিমানের ভূমিকাও অবহেলিত ছিল। রয়্যাল এয়ার ফোর্স রয়্যাল নেভিকে সহায়তা দিতে একটি কোস্টাল কমান্ড গঠন করলেও তাদের পর্যাপ্ত বিমান ছিল না, দীর্ঘ-পাল্লার বিমানের অভাব ছিল এবং বিমানচালকদের ডুবোজাহাজ-বিরোধী যুদ্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। ডুবোজাহাজের বিরুদ্ধে তাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল অপ্রতুল বোমা। সর্বোপরি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অন্যান্য অস্ত্রের তুলনায় সামুদ্রিক মাইন বেশি ইউ-বোট ডুবিয়েছিল। জাহাজ চলাচলের পথ রক্ষার জন্য চ্যানেল এবং পূর্ব উপকূলে মাইন ক্ষেত্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়, এবং আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে জার্মান ইউ-বোটের পথে আক্রমণাত্মক মাইন ব্যারেজ স্থাপনের পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়।[১৯]

প্রথম দিকের সংঘর্ষ (সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ – মে ১৯৪০)

[সম্পাদনা]

১৯৩৯ সালে, জার্মান নৌবাহিনী (ক্রিগ্সমারিন) এতটা শক্তিশালী ছিল না যে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি আর ফরাসি নৌবাহিনীর সঙ্গে সমুদ্রে লড়াই করতে পারে। তাই তারা ব্রিটিশ ও ফরাসি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কৌশল নেয়। এজন্য তারা বড় যুদ্ধজাহাজ, সশস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজ, ডুবোজাহাজ (ইউ-বোট) আর বিমান ব্যবহার করত। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় অনেক জার্মান জাহাজ সমুদ্রে ছিল। এর মধ্যে ছিল বেশিরভাগ ইউ-বোট আর দুটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ—ডয়েচল্যান্ড আর অ্যাডমিরাল গ্রাফ স্পি—যারা আগস্টে আটলান্টিকে পাঠানো হয়েছিল। এই জাহাজগুলো তৎক্ষণাৎ ব্রিটিশ ও ফরাসি জাহাজে হামলা শুরু করে। যুদ্ধ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইউ-৩০ একটি যাত্রীবাহী জাহাজ, এসএস অ্যাথেনিয়া, ডুবিয়ে দেয়, যদিও তাদের এমন জাহাজ আক্রমণ না করার নির্দেশ ছিল। তখন ইউ-বোটের সংখ্যা কম ছিল; ৫৭টি ইউ-বোটের মধ্যে অনেকগুলো ছিল ছোট ও কাছাকাছি অঞ্চলে কাজ করার জন্য উপযুক্ত। এগুলো মূলত ব্রিটিশ উপকূলের কাছে মাইন পাতার কাজে ব্যবহৃত হতো। জার্মানরা শুরুতে ব্রিটিশ বন্দরের কাছে বিমান, ডেস্ট্রয়ার আর ইউ-বোট দিয়ে মাইন পেতে ব্যস্ত ছিল।

যুদ্ধ শুরু হতেই ব্রিটিশ ও ফরাসিরা জার্মানির বিরুদ্ধে সমুদ্রে অবরোধ শুরু করে, কিন্তু শুরুতে এটি জার্মান শিল্পের উপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। রয়্যাল নেভি দ্রুত বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষার জন্য কনভয় ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ব্রিটিশ দ্বীপ থেকে পানামা, বোম্বে আর সিঙ্গাপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। কনভয়ে ৩০ থেকে ৭০টি নিরস্ত্র বাণিজ্যিক জাহাজ থাকত, আর রয়্যাল নেভি তাদের রক্ষী জাহাজগুলোকে কনভয়ের কাছাকাছি রাখত, কারণ ইউ-বোট সেখানেই আক্রমণ করত।

কিছু ব্রিটিশ নৌ-অফিসার, বিশেষ করে উইনস্টন চার্চিল, আরও আক্রমণাত্মক কৌশল চাইছিলেন। তারা বিমানবাহী রণতরী দিয়ে শিকারি দল গঠন করে, যারা পশ্চিমা সমুদ্রপথে টহল দিয়ে ইউ-বোট খুঁজত। কিন্তু এই কৌশল কাজ করেনি। ইউ-বোটগুলো ছোট হওয়ায় যুদ্ধজাহাজ দেখেই ডুব দিত। বিমানগুলো ডুবোজাহাজ দেখতে পেলেও তাদের আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র ছিল না, আর যুদ্ধজাহাজ পৌঁছানোর আগেই ইউ-বোট সরে যেত। এই কৌশল কয়েক দিনের মধ্যে ব্যর্থ হয়। ১৯৩৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, ব্রিটেনের আধুনিক রণতরী এইচএমএস আর্ক রয়্যাল ইউ-৩৯-এর তিনটি টর্পেডো থেকে বেঁচে যায়, কারণ টর্পেডোগুলো ভুলভাবে ফেটে যায়। ইউ-৩৯-কে রক্ষী জাহাজের চাপে ভাসতে বাধ্য করা হয় এবং নিজেরাই ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এটিই ছিল যুদ্ধের প্রথম ইউ-বোট ধ্বংস। তিন দিন পর, আরেকটি রণতরী, এইচএমএস কারেজিয়াস, ইউ-২৯-এর হামলায় ডুবে যায়।

এর এক মাস পর, গুন্থার প্রেইনের নেতৃত্বে ইউ-৪৭ ব্রিটিশ নৌঘাঁটি স্ক্যাপা ফ্লো-তে ঢুকে নোঙ্গরে থাকা পুরনো যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস রয়্যাল ওক ডুবিয়ে দেয়। এতে প্রিয়েন জার্মানিতে নায়ক হয়ে ওঠেন।

অ্যাডমিরাল গ্রাফ স্পি ডুবিয়ে দেওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তের ছবি।

দক্ষিণ আটলান্টিকে, অ্যাডমিরাল গ্রাফ স্পি-এর হামলায় ব্রিটিশরা চাপে পড়ে। যুদ্ধের প্রথম তিন মাসে এই জাহাজটি দক্ষিণ আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে ৫০,০০০ টন ধারণক্ষমতার নয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবায়। এটি ও উত্তর আটলান্টিকে থাকা ডয়েচল্যান্ডকে ধরতে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা তিনটি যুদ্ধক্রুজার, তিনটি বিমানবাহী রণতরী ও ১৫টি ক্রুজার নিয়ে শিকারি দল তৈরি করে। কিন্তু তারা সফল হয়নি, যতক্ষণ না অ্যাডমিরাল গ্রাফ স্পি আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মধ্যবর্তী রিভার প্লেটে একটি দুর্বল ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এটি নিরপেক্ষ মন্টিভিডিও বন্দরে আশ্রয় নেয় এবং ১৯৩৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর নিজেই ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

এই ঘটনার পর আটলান্টিকে হামলা কিছুটা কমে যায়। ইউ-বোটের কমান্ডার কার্ল ডোনিৎস যুদ্ধের শুরুতে সব ইউ-বোট টহলে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। সেপ্টেম্বরে প্রায় সব ইউ-বোট সমুদ্রে ছিল। কিন্তু এত তীব্রভাবে চালানো সম্ভব ছিল না, কারণ জাহাজগুলোকে জ্বালানি, অস্ত্র ও রসদের জন্য বন্দরে ফিরতে হতো। ১৯৩৯-৪০ সালের কঠিন শীতে বাল্টিক সাগরের অনেক বন্দর বরফে জমে যায়, ফলে অনেক নতুন ইউ-বোট আটকে পড়ে। ১৯৪০ সালের শুরুতে হিটলার নরওয়ে ও ডেনমার্ক দখলের পরিকল্পনা (অপারেশন ভেজারউব্যুং) করেন, তাই বেশিরভাগ যুদ্ধজাহাজ ও ইউ-বোট ফিরিয়ে নেওয়া হয়। নরওয়ের অভিযানে জার্মান টর্পেডোগুলোর বড় সমস্যা ধরা পড়ে। এগুলোর আঘাতের ব্যবস্থা (ইমপ্যাক্ট পিস্টল) ও চৌম্বক ব্যবস্থা (ম্যাগনেটিক পিস্টল) ত্রুটিপূর্ণ ছিল। টর্পেডোগুলো সঠিক গভীরতায় না চলায় লক্ষ্যের নিচ দিয়ে চলে যেত। ৩৮টির বেশি হামলায় মাত্র একটি ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ ডুবেছিল। এই খবর ইউ-বোট বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়। মিত্রশক্তির জাহাজে চৌম্বক ক্ষেত্র কমানোর পদ্ধতির কারণে চৌম্বক ব্যবস্থা কম কার্যকর হয়।[২০] তাই ডোনিৎস ব্রিটিশ জাহাজ এইচএমএস সিল থেকে নকল করা নতুন আঘাতের ব্যবস্থা ব্যবহার করেন। টর্পেডোর গভীরতা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ১৯৪২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সমাধান হয়নি, তখনই এগুলো আরও নির্ভরযোগ্য হয়।[২১][২২]

ব্রিটিশদের পরিস্থিতি

[সম্পাদনা]

১৯৪০ সালের এপ্রিলে নরওয়েতে জার্মানির দখল, মে ও জুন মাসে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের দ্রুত বিজয় এবং জুনে অক্ষশক্তির পক্ষে ইতালির যুদ্ধে যোগদান—এই তিনটি প্রধান কারণে সমুদ্রে যুদ্ধ এবং বিশেষ করে আটলান্টিকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়:

  • ব্রিটেন তার সবচেয়ে বড় মিত্রকে হারায়: ১৯৪০ সালে ফরাসি নৌবাহিনী ছিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম নৌবাহিনী। হাতেগোনা কয়েকটি ফরাসি জাহাজ 'ফ্রি ফ্রেঞ্চ ফোর্সেস'-এ যোগ দিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, যদিও পরে তাদের সঙ্গে কিছু কানাডিয়ান ডেস্ট্রয়ার যোগ দেয়। ফরাসি নৌবহর যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ায় ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। ইতালির যুদ্ধ ঘোষণার ফলে ব্রিটেনকে ভূমধ্যসাগরের নৌবহরকে আরও শক্তিশালী করতে হয় এবং ফরাসি নৌবহরের শূন্যতা পূরণের জন্য জিব্রাল্টারে 'ফোর্স এইচ' নামে একটি নতুন দল গঠন করতে হয়।
  • ইউ-বোটগুলো সরাসরি আটলান্টিকে প্রবেশের সুযোগ পায়: ইংলিশ চ্যানেল তুলনামূলকভাবে অগভীর ছিল এবং ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাইনফিল্ড দিয়ে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ থাকায় ইউ-বোটগুলোকে চ্যানেল এড়িয়ে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের চারপাশ দিয়ে ঘুরে আটলান্টিকে যেতে বলা হয়। ফ্রান্সে ব্রেস্ত, লোরিয়েন্ট এবং লা রোশেলের কাছে লা প্যালিসের মতো জার্মান ঘাঁটিগুলো উত্তর সাগরের ঘাঁটিগুলোর চেয়ে প্রায় ৭২০ কিলোমিটার (৪৫০ মাইল) আটলান্টিকের কাছে ছিল। এর ফলে ইউ-বোটগুলোর জন্য আটলান্টিকের পরিস্থিতি অনেক সহজ হয়ে যায়। তারা আরও পশ্চিমে গিয়ে কনভয়ের ওপর হামলা চালাতে পারত এবং টহলের জন্য বেশি সময় পেত, যা কার্যকরভাবে ইউ-বোট বাহিনীর আকার দ্বিগুণ করে দিয়েছিল। পরে জার্মানি ফরাসি আটলান্টিক ঘাঁটিগুলোতে ইউ-বোটের জন্য বিশাল কংক্রিটের সুরক্ষিত সাবমেরিন ঘাঁটি তৈরি করে, যা ১৯৪৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে 'ট্যালবয়' বোমার আগমন পর্যন্ত মিত্রশক্তির বোমা হামলা থেকে নিরাপদ ছিল। জুলাইয়ের শুরু থেকে ইউ-বোটগুলো তাদের আটলান্টিকের টহল শেষ করে নতুন ফরাসি ঘাঁটিগুলোতে ফিরতে শুরু করে, যার মধ্যে লোরিয়েন্টে প্রথম ফেরে U-30।
  • ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ারগুলোকে আটলান্টিক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়: নরওয়ে অভিযান এবং নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সে জার্মানির আক্রমণের কারণে রয়্যাল নেভির ডেস্ট্রয়ার বহরের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। এপ্রিল ও মে মাসে অনেক পুরনো ডেস্ট্রয়ারকে জাহাজবহরের পথ থেকে সরিয়ে নরওয়ে অভিযানে সহায়তা করার জন্য পাঠানো হয়। পরে ডানকার্ক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য সেগুলোকে ইংলিশ চ্যানেলে পাঠানো হয়। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেন একটি গুরুতর আক্রমণের হুমকির মুখে পড়ে। অনেক ডেস্ট্রয়ারকে জার্মান আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য চ্যানেলে আটকে রাখা হয়। লুফ্টওয়াফের (Luftwaffe) 'ফ্লিগারফ্যুহরার আটলান্টিক' (Fliegerführer Atlantik)-এর বিমান হামলায় তাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নরওয়ে অভিযানে সাতটি, ডানকার্কের যুদ্ধে ছয়টি এবং মে ও জুলাইয়ের মধ্যে চ্যানেল ও উত্তর সাগরে আরও দশটি ডেস্ট্রয়ার হারিয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই বিমান হামলায় ধ্বংস হয়, কারণ সেগুলোতে পর্যাপ্ত বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না। এছাড়া, আরও অসংখ্য জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফ্রান্সের ব্রেতানি অঞ্চলের লোরিয়েন্ট শহরে অবস্থিত জার্মান সাবমেরিন ঘাঁটি।

পশ্চিম ইউরোপে হিটলারের অভিযান শেষ হওয়ার অর্থ ছিল যে নরওয়ে অভিযানের জন্য আটলান্টিক থেকে সরিয়ে নেওয়া ইউ-বোটগুলো আবার বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু করতে পারত। এর ফলে আটলান্টিকে ইউ-বোটের সংখ্যা বাড়তে থাকে, আর জাহাজবহরের সুরক্ষাকারী জাহাজের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। ব্রিটিশদের জন্য একমাত্র স্বস্তি ছিল যে নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডসের মতো দখলকৃত দেশগুলোর বিশাল বাণিজ্যিক নৌবহরগুলো ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। জার্মানির ডেনমার্ক ও নরওয়ে দখলের পর ব্রিটেন আইসল্যান্ড এবং ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ দখল করে সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করে, যা জার্মানদের দখল করা থেকে তাদের রক্ষা করে।

এই পরিস্থিতিতেই ১৯৪০ সালের ১০ মে প্রধানমন্ত্রী হওয়া উইনস্টন চার্চিল প্রথম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে চিঠি লেখেন এবং পুরনো পঞ্চাশটি মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ধার দেওয়ার অনুরোধ করেন। এর ফলস্বরূপ 'ডেস্ট্রয়ার্স ফর বেসেস অ্যাগ্রিমেন্ট' (Destroyers for Bases Agreement) চুক্তি হয়, যা মূলত রাজনৈতিক কারণে একটি ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। এর বিনিময়ে নিউফাউন্ডল্যান্ড, বারমুডা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের নির্দিষ্ট কিছু ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ৯৯ বছরের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইজারা দেওয়া হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি লাভজনক চুক্তি ছিল এবং ব্রিটেনের জন্য সামরিক দিক থেকে উপকারী ছিল, কারণ এর ফলে ব্রিটিশ সামরিক সম্পদ আবার ইউরোপে ফিরে আসার সুযোগ পায়। মার্কিন জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুদ্ধে যোগদানের বিরোধী ছিল এবং কিছু আমেরিকান রাজনীতিবিদ (যাদের মধ্যে ব্রিটেনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ পি. কেনেডিও ছিলেন) মনে করতেন যে ব্রিটেন ও তার মিত্ররা যুদ্ধে হেরে যেতে পারে। এই ডেস্ট্রয়ারগুলোর মধ্যে প্রথমগুলো ব্রিটিশ ও কানাডিয়ান নাবিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয় কেবল সেপ্টেম্বরে, এবং সেগুলোর সবগুলোকে নতুন করে সশস্ত্র করতে এবং ASDIC (আসল নাম সোনর) স্থাপন করতে হয়েছিল। এসব জাহাজ এই অভিযানে কার্যকরভাবে অবদান রাখতে আরও অনেক মাস সময় লেগেছিল।

'সুখের সময়' (জুন ১৯৪০ - ফেব্রুয়ারী ১৯৪১)

[সম্পাদনা]
গ্র্যান্ড অ্যাডমিরাল এরিখ রায়েডার অটো ক্রেচমার (বামে) এর সাথে, আগস্ট ১৯৪০।

১৯৪০ সালের জুন থেকে ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কাল জার্মান ইউ-বোটের নাবিকদের কাছে 'সুখের সময়' (Die Glückliche Zeit) নামে পরিচিত ছিল। ফ্রান্সের ঘাঁটি থেকে পরিচালিত ইউ-বোট অভিযানগুলো এই সময়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিল। এই সময়ের বিখ্যাত ইউ-বোট কমান্ডারদের মধ্যে ছিলেন ইউ-৪৭-এর গুন্থার প্রাইন, ইউ-৯৯-এর অটো ক্রেৎচমার, ইউ-১০০-এর ইওয়াকিম শেপকে, ইউ-৪৬-এর এঙ্গেলবের্ট এন্দ্রাস, ইউ-৩৭-এর ভিক্টর ওয়ের্ন এবং ইউ-৪৮-এর হাইনরিখ ব্লাইখরোড। জার্মানিতে ইউ-বোটের ক্রুরা রাতারাতি জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৪০ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মিত্রশক্তির ২৭০টিরও বেশি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়। উইনস্টন চার্চিল পরে লিখেছিলেন, "যুদ্ধের সময় একমাত্র ইউ-বোটের হুমকিই আমাকে ভীত করেছিল।"

ইউ-বোটের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সাগরের বিশালতায় মিত্রশক্তির নৌবহর শনাক্ত করা। জার্মানদের হাতে ছিল স্বল্পসংখ্যক দীর্ঘ-পাল্লার ফকে-উল্ফ এফডব্লিউ ২০০ কন্ডর বিমান, যা বর্দো এবং স্ট্যাভেঞ্জার থেকে গোয়েন্দাগিরির জন্য ব্যবহৃত হতো। এই কন্ডর বিমানগুলো ছিল রূপান্তরিত যাত্রীবাহী বিমান, যা ফ্লিয়েগারফুহরার আটলান্টিকের জন্য সাময়িক সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। লুফটওয়াফে (জার্মান বিমান বাহিনী) এবং ক্রিগ্সমেরিনের (জার্মান নৌবাহিনী) মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্বের কারণে নৌবহর শনাক্তকরণের প্রধান দায়িত্ব পড়েছিল ইউ-বোটের উপর। ডুবোজাহাজের উপরের অংশ পানির কাছাকাছি থাকায় তাদের দৃশ্যমান শনাক্তকরণের সীমা ছিল খুবই সীমিত।

নৌবহর শনাক্তকরণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় ছিল বি-ডিন্সট কোডব্রেকারদের সাফল্য। তারা ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সাইফার নং-৩ ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল, যার ফলে জার্মানরা নৌবহরের সম্ভাব্য অবস্থান ও সময় অনুমান করতে পারত।

এর প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশরা অপারেশনস রিসার্চ কৌশল প্রয়োগ করে নৌবহর রক্ষার জন্য কিছু অপ্রত্যাশিত সমাধান বের করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি নৌবহরের আয়তন তার পরিধির বর্গ অনুপাতে বৃদ্ধি পায়। ফলে, একই সংখ্যক জাহাজ ও এসকর্ট দুটি ছোট নৌবহরের চেয়ে একটি বড় নৌবহরে থাকলে বেশি সুরক্ষিত থাকে। বড় নৌবহর শনাক্ত করা ছোট নৌবহরের মতোই কঠিন। কম সংখ্যক বড় নৌবহর একই পরিমাণ পণ্য বহন করতে পারত, যা শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দিত। তাছাড়া, বড় নৌবহর গঠন করতে বেশি সময় লাগায় এগুলোর চলাচলের ফ্রিকোয়েন্সি কম ছিল। ফলে, কম এসকর্ট সহ কয়েকটি বড় নৌবহর অনেক ছোট নৌবহরের তুলনায় নিরাপদ ছিল, যদিও ছোট নৌবহরে এসকর্ট ও বাণিজ্যিক জাহাজের অনুপাত বেশি থাকত।

একটি সাবমেরিন একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে শেল করছে যেটি টর্পেডো আঘাতের পরেও ভাসছিল।

মিত্রশক্তির নৌবহরে এককভাবে আক্রমণের পরিবর্তে, ইউ-বোটগুলোকে রেডিওর মাধ্যমে সমন্বিত 'নেকড়ে দল' (wolf packs) হিসেবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই দলগুলো নৌবহরের পথের মাঝখানে দীর্ঘ টহল লাইনে ছড়িয়ে থাকত। অবস্থান নেওয়ার পর ক্রুরা দূরবীন দিয়ে দিগন্তে জাহাজের মাস্তুল বা ধোঁয়া খুঁজত অথবা প্রপেলারের শব্দ শনাক্ত করতে হাইড্রোফোন ব্যবহার করত। কোনো ইউ-বোট নৌবহর দেখতে পেলে তা সদর দপ্তরে জানাত এবং অন্য ইউ-বোট আসা পর্যন্ত, সাধারণত রাতে, নৌবহরের পিছু নিত। ফলে, এসকর্ট জাহাজগুলোকে একক ডুবোজাহাজের বদলে একসঙ্গে আক্রমণকারী প্রায় অর্ধ ডজন ইউ-বোটের মোকাবিলা করতে হতো। ক্রেৎচমারের মতো সাহসী কমান্ডাররা এসকর্টদের সুরক্ষা বলয় ভেদ করে বাণিজ্যিক জাহাজের সারির মাঝখান থেকে আক্রমণ করত। এসকর্ট জাহাজগুলোর সংখ্যা ছিল অপ্রতুল এবং তাদের স্থায়িত্ব সীমিত ছিল। রাতে পানির উপরে একাধিক ইউ-বোটের আক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ছিল না। এএসডিআইসি (ASDIC) যন্ত্র কেবল পানির নিচের লক্ষ্যবস্তুতে ভালো কাজ করত। প্রাথমিক ব্রিটিশ সামুদ্রিক রাডারের লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও দূরত্ব নির্ণয়ের ক্ষমতা ছিল সীমিত। করভেট জাহাজগুলো পানির উপরে থাকা ইউ-বোট ধরার জন্য খুবই ধীরগতির ছিল।

'নেকড়ে দল' কৌশল ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রথম সফলভাবে ব্যবহৃত হয় এবং ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। ২১শে সেপ্টেম্বর, ৪২টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়ে গঠিত এইচএক্স ৭২ নৌবহরে চারটি ইউ-বোটের দল আক্রমণ করে। দু’রাতে তারা ১১টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় এবং দুটিতে ক্ষতি করে। অক্টোবরে, ধীরগতির এসসি ৭ নৌবহর, যার এসকর্টে ছিল দুটি স্লুপ ও দুটি করভেট, সহজেই পরাভূত হয় এবং ৫৯% জাহাজ হারায়। এইচএক্স ৭৯-এর যুদ্ধে এসকর্টদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। শক্তিশালী এসকর্ট (দুটি ডেস্ট্রয়ার, চারটি করভেট, তিনটি ট্রলার ও একটি মাইনসুইপার) থাকা সত্ত্বেও নৌবহরের এক-চতুর্থাংশ জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়, অথচ ইউ-বোটের কোনো ক্ষতি হয়নি। এটি ব্রিটিশদের অপ্রতুল ডুবোজাহাজ-বিরোধী কৌশলের বিপরীতে জার্মান কৌশলের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। ১লা ডিসেম্বর, সাতটি জার্মান ও তিনটি ইতালীয় ডুবোজাহাজ এইচএক্স ৯০-কে আক্রমণ করে ১০টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় এবং তিনটিতে ক্ষতি করে।

১৯৪০ সালের শেষে, ডুবিয়ে দেওয়া জাহাজের সংখ্যা দেখে অ্যাডমিরালটি ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলো টিকে গেলেও দীর্ঘদিন অকেজো থাকত। প্রায় দুই মিলিয়ন গ্রস টন বাণিজ্যিক জাহাজ—ব্রিটিশ নৌবহরের ১৩%—মেরামতের জন্য অকেজো ছিল, যা আটলান্টিক জুড়ে পণ্য সরবরাহের গতি মন্থর করে দিয়েছিল। ইউ-বোটই একমাত্র হুমকি ছিল না। অপারেশন ওয়েসেরুবুং-এর সময় সমুদ্রযুদ্ধে কিছু অভিজ্ঞতার পর লুফটওয়াফে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ শুরু করে। ১৯৪১ সাল থেকে মার্টিন হার্লিংহাউসেনের নেতৃত্বে ফ্লিয়েগারফুহরার আটলান্টিক কমান্ড স্বল্পসংখ্যক এফডব্লিউ ২০০ কন্ডর বিমান দিয়ে আটলান্টিকের যুদ্ধে অংশ নেয়। এই বিমানগুলো স্থল-ভিত্তিক যুদ্ধবিমানের সীমার বাইরে থাকা অরক্ষিত নৌবহরে বোমা হামলা করত। ১৯৪১ সালের প্রথম দিকে কন্ডরগুলো ৩৬৫,০০০ টন জাহাজের ক্ষতি করে, যা প্রাথমিকভাবে অত্যন্ত সফল ছিল। তবে, এই বিমানগুলোর সংখ্যা ছিল কম এবং সরাসরি লুফটওয়াফের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পাইলটদের জাহাজ-বিরোধী যুদ্ধের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ না থাকায় তাদের কার্যকারিতা সীমিত ছিল।

আটলান্টিক মহাসাগরে ইতালীয় সাবমেরিন

[সম্পাদনা]

জার্মানরা তাদের মিত্রদের কাছ থেকেও সহায়তা পেয়েছিল। ১৯৪০ সালের আগস্ট থেকে ২৭টি ইতালীয় ডুবোজাহাজ বোর্দোর বেটাসম ঘাঁটি থেকে আটলান্টিকে মিত্রশক্তির জাহাজে আক্রমণ চালায়। এই ডুবোজাহাজগুলো জার্মান ইউ-বোটের তুলনায় ভিন্ন কৌশলে কাজ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। তাদের বড় কনিং টাওয়ার, পানির উপরে ধীর গতি এবং আধুনিক টর্পেডো ফায়ার কন্ট্রোলের অভাবের মতো ত্রুটি ছিল। ফলে, তারা নৌবহরে আক্রমণের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তবে, দূরবর্তী সমুদ্রে বিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজ শিকারে তারা তাদের উচ্চতর পরিসর ও জীবনযাত্রার মানের সুবিধা নিতে পারত। ১৯৪৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৩২টি ইতালীয় ডুবোজাহাজ ৫৯৩,৮৬৪ টন ওজনের ১০৯টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়, বিনিময়ে ১৭টি ডুবোজাহাজ হারায়। এই জাহাজ-ডুবানোর অনুপাত জার্মানির সমতুল্য ছিল এবং সামগ্রিকভাবে উচ্চতর ছিল। ইতালীয়রা মানুষ-নিয়ন্ত্রিত টর্পেডো ব্যবহার করে জিব্রাল্টারে বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ জাহাজ অকেজো করতেও সফল হয়।

এই সাফল্য সত্ত্বেও, জার্মান কমান্ডার ডোনিৎজ ইতালীয়দের অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেননি। তিনি ইতালীয়দের "অপর্যাপ্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ" এবং "শত্রুর মুখোমুখি হয়ে শান্ত থাকতে অক্ষম" বলে মনে করতেন। তারা নেকড়ে দল কৌশলে সহযোগিতা করতে বা নির্ভরযোগ্যভাবে যোগাযোগ ও আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে, তাদের কার্যক্ষেত্র জার্মানদের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। আটলান্টিকে সফল ইতালীয় কমান্ডারদের মধ্যে ছিলেন এনরিকো তাজ্জোলি-এর কমান্ডার কার্লো ফেচিয়া ডি কসাতো এবং আর্কিমিডে ও লিওনার্দো দা ভিঞ্চি-এর কমান্ডার জানফ্রাঙ্কো গাজ্জানা-প্রিয়ারোজ্জা।

দুর্ধর্ষ ভাসমান হানাদার

[সম্পাদনা]
এইচএমএস হুড (দূরে) যুদ্ধজাহাজটি ১৯৪১ সালের ২৪শে মে জার্মান যুদ্ধজাহাজ বিসমার্কের হাতে ডুবে যাওয়ার কয়েক মিনিট আগে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যাচ্ছে।

সাফল্য সত্ত্বেও, ইউ-বোটগুলোকে উত্তর আটলান্টিকের কনভয়গুলোর জন্য তখনও প্রধান হুমকি হিসেবে গণ্য করা হতো না। ড্যোনিৎসের মতো কিছু ব্যতিক্রমী ব্যক্তি ছাড়া, উভয় পক্ষের অধিকাংশ নৌ কর্মকর্তাই ভূপৃষ্ঠের যুদ্ধজাহাজগুলোকে বাণিজ্য ধ্বংসের চূড়ান্ত অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতেন।

১৯৪০ সালের প্রথমার্ধে আটলান্টিকে কোনো জার্মান ভাসমান হানাদার ছিল না, কারণ নরওয়ে আগ্রাসনের জন্য জার্মান নৌবহরকে অন্যত্র কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। একমাত্র পকেট ব্যাটেলশিপ হানাদার, ‘অ্যাডমিরাল গ্রাফ স্পি’-কে ‘ব্যাটল অফ দ্য রিভার প্লেট’-এ তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও কম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একটি ব্রিটিশ স্কোয়াড্রন থামিয়ে দিয়েছিল। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে জার্মানি থেকে যুদ্ধজাহাজ এবং সশস্ত্র বাণিজ্যিক হানাদারের একটি ছোট কিন্তু নিয়মিত স্রোত আটলান্টিকের দিকে যাত্রা শুরু করে।

একটি কনভয়ের বিরুদ্ধে একটি হানাদারের শক্তি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৪০ সালের ৫ই নভেম্বর পকেট ব্যাটেলশিপ ‘অ্যাডমিরাল শেয়ার’ দ্বারা আক্রান্ত কনভয় HX 84-এর পরিণতিতে। ‘অ্যাডমিরাল শিয়ার’ দ্রুত পাঁচটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় এবং আরও কয়েকটি জাহাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে কনভয়টি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। শুধুমাত্র রক্ষী হিসেবে থাকা সশস্ত্র মার্চেন্ট ক্রুজার ‘এইচএমএস জার্ভিস বে’-এর আত্মত্যাগ (যার কমান্ডার এডওয়ার্ড ফেগেনকে মরণোত্তর ভিক্টোরিয়া ক্রস দেওয়া হয়েছিল) এবং সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের কারণে অন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পালাতে সক্ষম হয়। ব্রিটিশরা উত্তর আটলান্টিকের কনভয় সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং হোম ফ্লিট ‘অ্যাডমিরাল শেয়ার’-কে আটকানোর একটি ব্যর্থ চেষ্টায় সমুদ্রে নামে, কিন্তু জাহাজটি দক্ষিণ আটলান্টিকে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরের মাসে ভারত মহাসাগরে এটি আবার আবির্ভূত হয়।

অন্যান্য জার্মান ভাসমান হানাদাররাও এবার তাদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করে। ১৯৪০ সালের বড়দিনের দিন, ক্রুজার ‘অ্যাডমিরাল হিপার’ সৈন্যবাহী কনভয় WS 5A-কে আক্রমণ করে, কিন্তু রক্ষী ক্রুজারদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এর দুই মাস পর, ১৯৪১ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, ‘অ্যাডমিরাল হিপার’ আরও বেশি সাফল্য পায়, যখন সে ১৯টি জাহাজ নিয়ে গঠিত অরক্ষিত কনভয় SLS 64-কে খুঁজে পায় এবং সাতটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে, ‘শার্নহর্স্ট’ ও ‘গ্‌নাইসেনাউ’ নামক দুটি ব্যাটেলশিপ ‘অপারেশন বার্লিন’-এর অধীনে বাণিজ্যিক নৌপথগুলোতে হানা দেওয়ার জন্য জার্মানি থেকে সমুদ্রে যাত্রা করে। আটলান্টিকে এতগুলো জার্মান হানাদার ছড়িয়ে পড়ায়, ব্রিটিশরা বাধ্য হয়ে যত বেশি সম্ভব কনভয়ের সাথে ব্যাটেলশিপ প্রহরী মোতায়েন করে। এই কৌশলটি দুইবার জার্মান ব্যাটেলশিপের আক্রমণ থেকে কনভয়গুলোকে বাঁচিয়ে দেয়। ফেব্রুয়ারিতে, পুরোনো ব্যাটেলশিপ ‘এইচএমএস র‍্যামিলিস’ কনভয় HX 106-এর উপর একটি আক্রমণ প্রতিহত করে। এক মাস পরে, ‘এইচএমএস মালয়’-এর উপস্থিতির কারণে SL 67 কনভয়টি রক্ষা পায়।

মে মাসে জার্মানরা তাদের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযানটি পরিচালনা করে: অপারেশন রাইনউবুং। নতুন ব্যাটেলশিপ ‘বিসমার্ক’ এবং ক্রুজার ‘প্রিনৎস ইউগেন’ কনভয় আক্রমণের জন্য সমুদ্রে নামে।[২৩] একটি ব্রিটিশ নৌবহর আইসল্যান্ডের কাছে এই হানাদারদের পথ আটকায়। ‘ব্যাটল অফ দ্য ডেনমার্ক স্ট্রেইট’-এ ব্রিটিশ ব্যাটেলক্রুজার ‘এইচএমএস হুড’ বিস্ফোরিত হয়ে ডুবে যায়, কিন্তু ‘বিসমার্ক’ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফ্রান্সের দিকে পালাতে বাধ্য হয়। ‘বিসমার্ক’ প্রায় তার গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু ‘আর্ক রয়্যাল’ বিমানবাহী রণতরী থেকে আসা এক বিমান হামলায় এটি বিকল হয়ে পড়ে এবং পরের দিন হোম ফ্লিটের আক্রমণে ডুবে যায়। এর পতন যুদ্ধজাহাজ দিয়ে হানা দেওয়ার যুগের অবসান ঘটায়। বিশেষ করে অনাড়ম্বর কিন্তু বহুমুখী PBY ক্যাটালিনার মতো দূরপাল্লার অনুসন্ধানকারী বিমানের আবির্ভাব, ভাসমান হানাদারদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল।

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ‘শার্নহর্স্ট’, ‘গ্‌নাইসেনাউ’ এবং ‘প্রিনৎস ইউগেন’ ব্রেস্ট থেকে জার্মানিতে "চ্যানেল ড্যাশ" নামক অভিযানে ফিরে আসে। যদিও এই ঘটনাটি ব্রিটিশদের জন্য বেশ বিব্রতকর ছিল, এটিই ছিল আটলান্টিকে জার্মান ভাসমান হানাদারদের হুমকির সমাপ্তি। ‘বিসমার্ক’-এর সলিলসমাধি, ভাসমান হানাদারদের সহায়তাকারী সরবরাহকারী জাহাজের নেটওয়ার্ক ধ্বংস, বিমান হামলায় তিনটি জাহাজের বারবার ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া, যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ, আর্কটিক কনভয় এবং নরওয়েতে আক্রমণের সম্ভাব্য হুমকি—এই সবকিছু হিটলার এবং নৌ-সৈন্যদের পিছু হটতে বাধ্য করেছিল।[২৪][২৫][২৬]

বহরের নিরাপত্তাকারী দল (মার্চ-মে, ১৯৪১)

[সম্পাদনা]
১৯৪১ সালে বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষতি (নীল) এবং সাবমেরিনের ক্ষতি (লাল)।

১৯৪০ সালের অক্টোবরে কনভয় যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির পর ব্রিটেন তাদের যুদ্ধের কৌশল বদলাতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল স্থায়ী কনভয় রক্ষী দল তৈরি করা, যা জাহাজ ও সৈন্যদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ায় এবং যুদ্ধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এছাড়া, ব্রিটিশ ও কানাডিয়ান নির্মিত নতুন ফ্লাওয়ার-ক্লাস করভেট জাহাজ এবং পুরানো মার্কিন বিধ্বংসী জাহাজের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই জাহাজগুলোর অনেকগুলো রয়্যাল কানাডিয়ান নৌবাহিনীতে যোগ দেয়, যারা যুদ্ধের শুরুতে মাত্র কয়েকটি জাহাজ থেকে ক্রমশ কনভয় রক্ষার বড় দায়িত্ব নিতে শুরু করে। কিছু জাহাজ ফ্রি ফ্রেঞ্চ, নরওয়েজিয়ান ও ডাচ নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত হতো, তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল এবং তারা ব্রিটিশ কমান্ডের অধীনে কাজ করতো। ১৯৪১ সালে মার্কিন জনমত জার্মানির বিরুদ্ধে ঘুরতে শুরু করে, তবে তখনও মূলত ব্রিটেন ও তার সাম্রাজ্যই জার্মানির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল।

প্রাথমিকভাবে, নতুন কনভয় রক্ষী দলগুলোতে ২-৩টি বিধ্বংসী এবং প্রায় ৬টি করভেট জাহাজ থাকতো। সাধারণত ২-৩টি জাহাজ মেরামতের জন্য ডকে থাকতো, তাই দলগুলো মোটামুটি ৬টি জাহাজ নিয়ে যাত্রা করতো। যুদ্ধের চাপ বাড়ার সাথে সাথে এসকর্টদের প্রশিক্ষণও উন্নত হয়। হেব্রাইডেসের টোবারমোরিতে ভাইস-এডমিরাল গিলবার্ট ও. স্টিফেনসনের কঠোর প্রশিক্ষণে নতুন জাহাজ ও ক্রুরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতো।[২৭]

১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, অ্যাডমিরাল্টি তাদের মুখ্যালয় প্লাইমাউথ থেকে লিভারপুলে সরিয়ে নেয়, যাতে আটলান্টিক কনভয়ের সাথে আরও ভালো যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। সহায়ক বিমানের সাথে সমন্বয়ও বাড়ে। এপ্রিলে, অ্যাডমিরাল্টি কোস্টাল কমান্ড বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এছাড়া, ১৯৪১ সালে নতুন শর্ট-ওয়েভ রাডার সেট আসতে শুরু করে, যা ইউ-বোট (জার্মান সাবমেরিন) শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

এই পরিবর্তনগুলোর ফল ১৯৪১ সালের শুরুতে যুদ্ধে দেখা যায়। মার্চে, বিখ্যাত ইউ-বোট কমান্ডার প্রিয়েনের ইউ-৪৭ ফিরে আসেনি। দুই সপ্তাহ পরে, কনভয় এইচএক্স ১১২-এর যুদ্ধে নতুন ৩য় এসকর্ট গ্রুপের ৪টি বিধ্বংসী ও ২টি করভেট ইউ-বোট প্যাককে আটকে দেয়। ইউ-১০০ রাডারে ধরা পড়ে এবং ডুবে যায়। এরপর ইউ-৯৯-ও ধরা পড়ে এবং ডুবে যায়, ক্রুরা বন্দী হয়। জার্মান কমান্ডার ডোনিটজ তার তিন শীর্ষ ইউ-বোট কমান্ডার—ক্রেতসমার, প্রিয়েন ও শেপকে—হারান।

ডোনিটজ তখন তার ইউ-বোট প্যাকগুলোকে আরও পশ্চিমে সরিয়ে নেন, যাতে কনভয়গুলোকে এসকর্ট জাহাজ যোগ দেওয়ার আগেই আক্রমণ করা যায়। এপ্রিলে এই কৌশল সফল হয়, যখন কনভয় এসসি ২৬-এর ১০টি জাহাজ ডুবে যায়। তবে এই সময়ে আরেকটি ইউ-বোটও হারিয়ে যায়।

যুদ্ধক্ষেত্রের সম্প্রসারন (জুন–ডিসেম্বর ১৯৪১)

[সম্পাদনা]

আমেরিকার সক্রিয়তা বৃদ্ধি

[সম্পাদনা]
ইউএসএস রেঞ্জার থেকে একটি এসবি২ইউ ভিন্ডিকেটর স্কাউট বোমারু বিমান ১৯৪১ সালের ২৭শে নভেম্বর কেপ টাউনের পথে কনভয় ডাব্লিউএস-১২ এর উপর দিয়ে সাবমেরিন-বিরোধী টহল দিচ্ছে। এই কনভয়টি ছিল এমন অনেকগুলোর মধ্যে একটি যাকে মার্কিন নৌবাহিনী "নিরপেক্ষতা টহল" এর অংশ হিসাবে পাহারা দিচ্ছিল, যদিও তখনো যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করেনি।

১৯৪১ সালের জুনে, ব্রিটিশরা উত্তর আটলান্টিক জুড়ে চলা কনভয়গুলোর (একসাথে চলাচলকারী জাহাজের বহর) পুরো পথের জন্য নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর জন্য ২৩ মে অ্যাডমিরালটি রয়্যাল কানাডিয়ান নৌবাহিনীকে পশ্চিমাঞ্চলের কনভয়গুলো সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে এবং নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জনসে তাদের মূল ঘাঁটি স্থাপন করতে অনুরোধ করে। ১৩ জুন, ১৯৪১-এ কমোডর লিওনার্ড মারে, রয়্যাল কানাডিয়ান নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে, নিউফাউন্ডল্যান্ড এসকর্ট ফোর্সের কমোডর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি লিভারপুলে অবস্থিত কমান্ডার-ইন-চিফ, ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেসের অধীনে কাজ করছিলেন। এই বাহিনীর জন্য ৬টি কানাডিয়ান ডেস্ট্রয়ার ও ১৭টি কর্ভেট, এবং রয়্যাল নেভির ৭টি ডেস্ট্রয়ার, ৩টি স্লুপ ও ৫টি কর্ভেটকে একত্রিত করা হয়। তাদের কাজ ছিল কনভয়গুলোকে কানাডার বন্দর থেকে নিউফাউন্ডল্যান্ড পর্যন্ত এবং এরপর আইসল্যান্ডের দক্ষিণে একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়া, যেখানে ব্রিটিশ এসকর্ট গ্রুপগুলো দায়িত্ব নিত।

১৯৪১ সাল নাগাদ, আমেরিকা নিরপেক্ষ থাকার কথা বললেও, তারা যুদ্ধে ক্রমশ বেশি জড়িয়ে পড়ছিল। ১৯৪০ সালে জার্মানির কাছে ডেনমার্কের পতনের পর ব্রিটিশ বাহিনী আইসল্যান্ড দখল করে। এরপর আমেরিকা ব্রিটিশ সৈন্যদের সরিয়ে নিজেদের বাহিনী সেখানে মোতায়েন করতে রাজি হয়। আমেরিকান যুদ্ধজাহাজগুলো পশ্চিম আটলান্টিকের আইসল্যান্ড পর্যন্ত মিত্র কনভয়গুলোকে এসকর্ট করা শুরু করে এবং এই সময়ে জার্মান ইউ-বোটগুলোর সঙ্গে তাদের বেশ কয়েকটি সংঘর্ষও হয়।

১৯৪১ সালের জুনে, আমেরিকা বুঝতে পারে যে নিরক্ষীয় আটলান্টিক মহাসাগর অরক্ষিত আমেরিকান এবং ব্রিটিশ জাহাজ উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ২১ মে, কোনো সামরিক সরঞ্জাম বহন না করা একটি আমেরিকান জাহাজ, এসএস রবিন মুর-কে ইউ-৬৯ ডুবিয়ে দেয়। ঘটনাটি ঘটে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউন থেকে প্রায় ১,৩৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে। এই খবর আমেরিকায় পৌঁছানোর পর, খুব কম শিপিং কোম্পানিই নিজেদের নিরাপদ মনে করে। জুন ১৯৪১-এ টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল, “যদি এমন ঘটনা ঘটতে থাকে, তবে যুদ্ধের ফ্রন্ট থেকে দূরে চলাচলকারী মার্কিন জাহাজগুলোও বিপদে পড়বে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে হয় তার জাহাজগুলোকে সমুদ্র থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে, নয়তো সমুদ্রের মুক্ত ব্যবহারের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করার পর ব্রিটিশ, কানাডিয়ান এবং আমেরিকান ডেস্ট্রয়ার ও কর্ভেট দিয়ে মিড-ওশান এসকর্ট ফোর্স নামে একটি নতুন বাহিনী গঠন করা হয়।

একই সময়ে, ব্রিটিশরা জার্মান সাবমেরিনের শ্রেষ্ঠত্ব মোকাবিলায় নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিল। যদিও এগুলো ছিল ব্রিটিশদের আবিষ্কার, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলো বিনা মূল্যে আমেরিকাকে দেওয়া হয়। আমেরিকা সেগুলোর নাম বদলে নিজেদের মতো করে তৈরি করতে থাকে। একইভাবে, আমেরিকাও ব্রিটিশদের ক্যাটালিনা ফ্লাইং বোট এবং লিবারেটর বোমারু বিমান সরবরাহ করে, যা যুদ্ধের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ক্যাটাপল্ট এয়ারক্রাফট মার্চেন্টম্যান (CAM)

[সম্পাদনা]
একটি সি হ্যারিকেন মার্ক আইএ একটি সিএএম জাহাজের ক্যাটাপল্টে রয়েছে।

আকাশপথে বিমানের সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়লেও, বিশাল আটলান্টিক মহাসাগরকে স্থলভিত্তিক বিমান দিয়ে পুরোপুরি কভার করা সম্ভব ছিল না। এই সমস্যার সাময়িক সমাধান হিসেবে কিছু কার্গো জাহাজের সামনের অংশে র‌্যাম্প যুক্ত করা হয়। এই জাহাজগুলো ক্যাটাপল্ট এয়ারক্রাফট মার্চেন্টম্যান (সিএএম জাহাজ) নামে পরিচিত ছিল এবং প্রতিটিতে একটি মাত্র হারিকেন ফাইটার বিমান থাকতো। যখন কোনো জার্মান বোমারু বিমান কনভয়ের কাছাকাছি আসতো, তখন রকেটের সাহায্যে এই বিমানটিকে র‌্যাম্প থেকে উৎক্ষেপণ করা হতো। এর কাজ ছিল জার্মান বিমানটিকে ধ্বংস করা বা তাড়িয়ে দেওয়া। কাজ শেষে পাইলটকে পানিতে নেমে যেতে হতো, এবং সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে তাকে জাহাজে ফিরিয়ে আনা হতো। মোট নয়টি যুদ্ধ মিশনে সিএএম জাহাজগুলো আটটি অক্ষশক্তির বিমান ধ্বংস করে, এবং এর বিনিময়ে একজন মিত্র পাইলটকে হারাতে হয়।

যদিও সিএএম জাহাজ ও তাদের হারিকেন ফাইটারগুলো বেশি সংখ্যক শত্রু বিমান ধ্বংস করেনি, তবুও তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এফডব্লিউ ২০০ কনডর-এর মতো বোমারু বিমানগুলোকে রুখতে সক্ষম হতো। এই বিমানগুলো প্রায়ই কনভয়ের বন্দুকের পাল্লার বাইরে থেকে কনভয়ের গতিপথ ও অবস্থান ইউ-বোটকে জানিয়ে দিতো। তাই, সিএএম জাহাজগুলো কনভয়গুলোকে ইউ-বোটের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে সামগ্রিকভাবে জাহাজের ক্ষতি কমিয়ে এই ব্যবস্থার খরচকে যৌক্তিক প্রমাণ করে।

হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ডিরেকশন-ফাইন্ডিং (HF/DF)

[সম্পাদনা]
The distinctive HF/DF "birdcage" aerial can be seen at the masthead of HMS Kite

যুদ্ধকালীন সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি ছিল জাহাজে ব্যবহৃত দিক-নির্ণয়কারী রেডিও সরঞ্জাম, যা এইচএফ/ডিএফ বা হাফ-ডাফ নামে পরিচিত। ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি এসকর্ট জাহাজগুলোতে লাগানো শুরু হয় এবং ১৯৪৩ সালের মধ্যে এটি খুবই সাধারণ সরঞ্জামে পরিণত হয়। এইচএফ/ডিএফ একজন অপারেটরকে রেডিও সংকেতের দিক খুঁজে বের করতে সাহায্য করত, এমনকি সংকেতের বার্তা না বুঝলেও। যেহেতু ইউ-বোটের দলগুলো (উলফ প্যাক) রেডিওর মাধ্যমে সদর দপ্তরে কনভয়ের অবস্থান জানাতো, তাই এই সংকেতগুলোকে বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল। একটি এসকর্ট জাহাজ তখন সংকেতের দিক অনুসরণ করে ইউ-বোটের ওপর আক্রমণ করতে পারত, অথবা অন্তত এটিকে ডুব দিতে বাধ্য করত, যার ফলে ইউ-বোটটি কনভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলতো। যখন দুটি এইচএফ/ডিএফ-যুক্ত জাহাজ একটি কনভয়ের সাথে থাকতো, তখন শুধু দিক নয়, ট্রান্সমিটারের সঠিক অবস্থানও নির্ধারণ করা সম্ভব হতো।

এনিগমা সাইফার

[সম্পাদনা]

ডনিৎজ তার ইউ-বোট অভিযান পরিচালনার জন্য ইউ-বোট এবং সদর দপ্তরের মধ্যে প্রচুর রেডিও যোগাযোগ করতেন। তিনি মনে করতেন এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, কারণ বার্তাগুলো এনিগমা সাইফার মেশিনের মাধ্যমে এনক্রিপ্ট করা হতো, যা জার্মানরা অলঙ্ঘনীয় মনে করত। এছাড়াও, জার্মান নৌবাহিনী (ক্রিগসমারিন) সেনাবাহিনী বা বিমানবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত পদ্ধতি ব্যবহার করত। মেশিনের তিনটি রটার আটটির মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হতো (অন্যান্য বাহিনীতে পাঁচটি থেকে)। প্রতি দুই দিন পরপর রটারগুলো পরিবর্তন করা হতো এবং প্রতিটি বার্তার জন্য সেটিং ভিন্ন হতো। ১৯৩৯ সালে, ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কোড অ্যান্ড সাইফার স্কুল, ব্লেচলি পার্কে, সবাই বিশ্বাস করত যে নৌবাহিনীর এনিগমা কোড ভাঙা সম্ভব নয়। কেবল জার্মান নৌবাহিনী বিভাগের প্রধান ফ্রাঙ্ক বার্চ এবং গণিতজ্ঞ অ্যালান টুরিং এর ব্যতিক্রম ছিলেন।

এনিগমা রোটর এবং স্পিন্ডল।

ব্রিটিশ কোডব্রেকারদের নৌবাহিনীর এনিগমা রটারের অভ্যন্তরীণ তারের গঠন জানা প্রয়োজন ছিল। ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এইচএমএস গ্লিনার-এর হাতে ইউ-৩৩ ডুবে যাওয়ার সময় বেশ কিছু এনিগমা রটার উদ্ধার করা হয়, যা এই তথ্য সরবরাহ করে। এরপর ১৯৪১ সালের ৯ মে, ডেস্ট্রয়ার বুলডগ-এর নাবিকেরা ইউ-১১০ দখল করে এবং বর্তমান এনিগমা কী সহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোলজিক সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এই তথ্য পাওয়ার পর ব্রিটিশরা কয়েক সপ্তাহের জন্য সব ইউ-বোটের বার্তা পড়তে সক্ষম হয়।

১৯৪১ সালের শেষের দিকে, এনিগমা বার্তাগুলোকে ডিকোড করার (এইচএফ/ডিএফ-এর সাথে একত্রিত করে) ফলে ব্রিটিশরা ইউ-বোটের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারছিল এবং সেই অনুযায়ী কনভয়গুলোর গতিপথ পরিবর্তন করে দিত। এর ফলে ১৯৪১ সালের জুলাই মাসে মার্চেন্ট জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কমে যায় এবং নভেম্বর পর্যন্ত তা কমই থাকে।

বিমানের হাতে ইউ-বোটের আত্মসমর্পণ

[সম্পাদনা]

১৯৪১ সালের ২৭ আগস্ট, আরএএফ-এর ২০৯ স্কোয়াড্রনের একটি কোস্টাল কমান্ড হাডসন বিমান আইসল্যান্ডের দক্ষিণে ইউ-৫৭০-কে আটক করে। স্কোয়াড্রন লিডার জে. থম্পসন পানির ওপর সাবমেরিনটি দেখতে পেয়ে সাথে সাথে নিচে নেমে চারটি ডেপথ চার্জ নিক্ষেপ করেন। সাবমেরিনটি আবার পানির উপরে উঠে আসে এবং ক্রু সদস্যরা ডেকে চলে আসে। থম্পসন তার বিমানের বন্দুক দিয়ে তাদের ওপর গুলি চালান। ক্রু সদস্যরা কনিং টাওয়ারে ফিরে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই, তারা একটি সাদা পতাকা ও সাদা বোর্ড প্রদর্শন করে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দেয়। থম্পসন সাহায্যের জন্য অনুরোধ জানান এবং সাবমেরিনটির চারপাশে ঘুরতে থাকেন। ততক্ষণে ২০৯ স্কোয়াড্রনের একটি ক্যাটালিনা বিমান এসে ক্ষতিগ্রস্ত ইউ-বোটটির ওপর নজরদারি শুরু করে, যতক্ষণ না লেফটেন্যান্ট হেনরি ওয়েন ল’এস্ট্রাঞ্জের নেতৃত্বে সশস্ত্র ট্রলার কিংস্টন অ্যাগেট সেখানে পৌঁছায়। পরের দিন ইউ-বোটটি আইসল্যান্ডের একটি উপসাগরের তীরে আটকে যায়। কোনো কোড বা গোপন কাগজপত্র উদ্ধার করা না গেলেও, ব্রিটিশরা একটি সম্পূর্ণ ইউ-বোটের দখল পায়। মেরামতের পর, ইউ-৫৭০-কে এইচএমএস গ্রাফ নামে রয়্যাল নেভিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ভূমধ্যসাগরের দিকে ইউ-বোটের গতি পরিবর্তন

[সম্পাদনা]

১৯৪১ সালের অক্টোবরে, হিটলার ডনিৎজকে ভূমধ্যসাগরে ইউ-বোট পাঠাতে নির্দেশ দেন, যাতে সেই অঞ্চলের জার্মান অভিযানকে সমর্থন করা যায়। এর ফলে জিব্রাল্টারের কাছে ইউ-বোটের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং জিব্রাল্টার ও সিয়েরা লিওনের কনভয়গুলোর আশেপাশে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে, কনভয় এইচজি ৭৬ যাত্রা শুরু করে। এর এসকর্টের দায়িত্বে ছিল ক্যাপ্টেন ফ্রেডেরিক জন ওয়াকারের নেতৃত্বে ৩৬তম এসকর্ট গ্রুপের দুটি স্লুপ এবং ছয়টি কর্ভেট। তাদের সাথে আরও ছিল প্রথম এসকর্ট ক্যারিয়ার এইচএমএস অডাসিটি এবং জিব্রাল্টার থেকে আসা তিনটি ডেস্ট্রয়ার। কনভয়টি সাথে সাথেই অপেক্ষারত ইউ-বোটের একটি দলের দ্বারা আক্রান্ত হয়, যার ফলে পাঁচ দিনের এক কঠিন যুদ্ধ শুরু হয়। ওয়াকার ছিলেন একজন চৌকস কৌশলবিদ এবং তার জাহাজের ক্রুরাও ছিল অত্যন্ত প্রশিক্ষিত। এসকর্ট ক্যারিয়ারের উপস্থিতির কারণে ইউ-বোটগুলোকে প্রায়ই দেখা যেত এবং কনভয়ের কাছে পৌঁছানোর আগেই ডুব দিতে বাধ্য হতো। এই সুবিধা অডাসিটি ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল। পাঁচ দিনের এই যুদ্ধে জার্মানরা পাঁচটি ইউ-বোট হারায় (এর মধ্যে চারটি ওয়াকারের গ্রুপের হাতে ডুবেছিল), অন্যদিকে ব্রিটিশরা অডাসিটি, একটি ডেস্ট্রয়ার এবং মাত্র দুটি মার্চেন্ট জাহাজ হারায়। এই যুদ্ধ ছিল মিত্রশক্তির প্রথম নিশ্চিত কনভয় বিজয়।

কঠোর প্রচেষ্টার মাধ্যমে, ১৯৪১ সালের শেষ পর্যন্ত মিত্রশক্তি ধীরে ধীরে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে। যদিও মিত্র যুদ্ধজাহাজগুলো প্রচুর সংখ্যক ইউ-বোট ডোবাতে ব্যর্থ হয়, তবুও বেশিরভাগ কনভয় কোনো আক্রমণ ছাড়াই তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছিল। সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি বেশি থাকলেও, তা ছিল নিয়ন্ত্রণে।

অপারেশন ড্রামবিট (জানুয়ারি–জুন ১৯৪২)

[সম্পাদনা]
১৯৪২ সালে ইউ-৭১ দ্বারা টর্পেডো করা মিত্রশক্তির ট্যাঙ্কার ডিক্সি অ্যারো।
১৯৪২ সালের নভেম্বরে মিত্রশক্তির একটি কনভয় আটলান্টিক পেরিয়ে পূর্ব দিকে ক্যাসাব্লাঙ্কার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে।

পার্ল হারবারে হামলা এবং জার্মানির যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর জার্মান কমান্ডার ডনিৎজ আমেরিকার পূর্ব উপকূলে জাহাজ আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। এই অভিযান, যাকে জার্মানরা "দ্বিতীয় সুখের সময়" বলত, শুরু করতে তার কাছে মাত্র পাঁচটি টাইপ IX ইউ-বোট ছিল, যা আমেরিকার জলসীমায় পৌঁছাতে পারত।

যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে আধুনিক নৌযুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা ব্ল্যাকআউট ব্যবস্থা চালু করেনি। ইউ-বোটগুলো রাতে উপকূলের কাছে থেকে শহরের আলোর আলোকে জাহাজ চিহ্নিত করে আক্রমণ করত। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল কিং ব্রিটিশদের পরামর্শ উপেক্ষা করেন, যারা উপকূলীয় ব্ল্যাকআউট বা কনভয় ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছিল। কিং মনে করতেন, বণিক জাহাজের চেয়ে সৈন্যবাহী জাহাজ রক্ষা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, তার জাহাজগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নে সরবরাহ পরিবহন এবং জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল। কিং ব্ল্যাকআউট বাধ্যতামূলক করতে পারেননি, কারণ বেসামরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল সেনাবাহিনীর। ফলে, বণিক জাহাজগুলো অরক্ষিত থেকে যায় এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। শেষে ব্রিটেনকে উপকূলীয় এসকর্ট জাহাজ সরবরাহ করতে হয়, কারণ কিং নিজে এর ব্যবস্থা করতে পারেননি।

১৩ জানুয়ারি ১৯৪২-এ প্রথম ইউ-বোটগুলো আমেরিকার জলসীমায় পৌঁছায়। ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তারা কোনো ক্ষতি ছাড়াই ১৫৬,৯৩৯ টন জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। পরে আরও টাইপ IX ও টাইপ VII ইউ-বোট আসে, যাদের সমুদ্রে জ্বালানি দিত টাইপ XIV "মিল্ক কাউ" ট্যাঙ্কার। মোট ৩৯৭টি জাহাজ ডুবে, যার টনেজ ছিল ২০ লক্ষের বেশি। ১৯৪৩-এ যুক্তরাষ্ট্র ১১০ লক্ষ টনের বেশি বণিক জাহাজ তৈরি করে, তবে পরে এই সংখ্যা কমে যায়।

মে মাসে কিং অবশেষে কনভয় ব্যবস্থা চালু করেন, যার ফলে সাতটি ইউ-বোট ধ্বংস হয়। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত জাহাজ না থাকায় ইউ-বোটগুলো ক্যারিবিয়ান ও মেক্সিকো উপসাগরে অবাধে কাজ চালায়, এমনকি কয়েকটি বন্দর বন্ধ করে দেয়। জুলাইয়ে ব্রিটিশ এসকর্ট জাহাজ, যার মধ্যে ২৪টি সাবমেরিন-বিরোধী ট্রলার ছিল, আসতে শুরু করলে এই এলাকায় হামলা কমে যায়। ১৯৪২-এর মাঝামাঝি আমেরিকান উপকূল ও ক্যারিবিয়ানে কনভয় ব্যবস্থা শুরু হলে ইউ-বোটগুলো আটলান্টিক কনভয়ের দিকে মনোযোগ দেয়। ১৯৪২-এ মিত্র বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি গুরুতর ছিল, কিন্তু সঙ্কটজনক হয়ে ওঠেনি।

আটলান্টিকে যুদ্ধের পুনরুত্থান (জুলাই ১৯৪২ – ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩)

[সম্পাদনা]
১৯৪২ সালে আইসল্যান্ডের কাছে মিত্রশক্তির কনভয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশেষে আটলান্টিক মহাসাগরের নিজেদের এলাকায় কনভয় পদ্ধতি চালু করায় ইউ-বোটের আক্রমণে জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত কমে যায়। এ অবস্থায় ডেনিটজ উপলব্ধি করেন যে তার ইউ-বোটগুলো অন্যত্র ব্যবহার করা অধিক ফলপ্রসূ হবে। ১৯৪২ সালের ১৯ জুলাই তিনি মার্কিন আটলান্টিক উপকূল থেকে শেষ ইউ-বোটগুলোকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন; জুলাই মাসের শেষ নাগাদ তিনি তার মনোযোগ আবার উত্তর আটলান্টিকের দিকে ফেরান। সেখানে মিত্রবাহিনীর বিমানবাহিনী সুরক্ষা দিতে পারত না—এই অঞ্চলটিই ছিল 'ব্ল্যাক পিট' বা 'অন্ধকার গহ্বর' নামে পরিচিত। কানাডা থেকে ব্রিটেনে যাওয়া কনভয়গুলোর পথে ইউ-বোটের প্রত্যাবর্তনের সূচনা করে SC 94 কনভয়টি। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলে (আটলান্টিকসহ) ক্রিয়াশীল সাবমেরিনের কমান্ড সেন্টারও স্থানান্তরিত হয়। এটি স্থানান্তরিত হয় অ্যাঞ্জার্স শহরের পূর্বে লোয়ার নদীর তীরে অবস্থিত পিগনিরোল প্রাসাদের (Château de Pignerolle) নবনির্মিত কমান্ড বাংকারে। এই সদর দপ্তরের নেতৃত্বে ছিলেন হান্স-রুডলফ রোজিং।

সারা আটলান্টিক জুড়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইউ-বোট মোতায়েন করা হয়েছিল, ফলে একাধিক 'নেকড়ে দল' (wolf pack) বিভিন্ন কনভয় রুটে একসঙ্গে আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়। প্রায়শই ১০ থেকে ১৫টি ইউ-বোট এক বা দুই ঢেউয়ে আক্রমণ করত। তারা দিনের বেলা SC 104 এবং SC 107-এর মতো কনভয়গুলোকে অনুসরণ করত এবং রাতের আঁধারে আক্রমণ চালাত। ফলে কনভয়ের ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বেড়ে যায়। ১৯৪২ সালের অক্টোবরে, গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী 'এয়ার গ্যাপ' বা বিমানশূন্য অঞ্চলে ২৫৮,০০০ টনেরও বেশি পণ্যবাহী ৫৬টি জাহাজ ডুবে যায়।

একই সময়ে ইউ-বোটের ক্ষয়ক্ষতিও বাড়তে থাকে। ১৯৪২ সালের প্রথম ছয় মাসে ২১টি ইউ-বোট ধ্বংস হয়, যার অর্থ প্রতি ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবানোর বিপরীতে ইউ-বোটের ক্ষতি ছিল একটিরও কম। কিন্তু বছরের শেষ ছয় মাসে ৬৬টি ইউ-বোট ডুবে যায়, অর্থাৎ প্রতি ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডোবানোর বিনিময়ে গড়ে একটি ইউ-বোট হারাতে হয়—এ পরিমাণ আগের দুই বছরের মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় সমান।

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে একটি কনভয় সম্মেলন চলছে।

১৯ নভেম্বর ১৯৪২-এ, অ্যাডমিরাল স্যার ম্যাক্স হর্টন ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেস কমান্ডের প্রধান হিসেবে অ্যাডমিরাল স্যার পার্সি নোবলের স্থলাভিষিক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আটলান্টিক মহাসাগরে জার্মান ইউ-বোটের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার দায়িত্বে ছিল এই ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেস কমান্ড। হর্টন ক্রমবর্ধমান সংখ্যক এস্কর্ট জাহাজের সুযোগ নিয়ে "সহায়ক গ্রুপ" (support groups) গঠন করেন, যেগুলোর কাজ ছিল আক্রান্ত কনভয়গুলোকে শক্তিশালী করা। নিয়মিত এস্কর্ট গ্রুপের বিপরীতে, এই সহায়ক গ্রুপগুলো কোনো নির্দিষ্ট কনভয়ের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ ছিল না। এর ফলে তাদের কাছে যুদ্ধকৌশলগত ব্যাপারে অনেক বেশি নমনীয়তা ছিল। রিকনাইসেন্স বা HF/DF (হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ডাইরেকশন ফাইন্ডিং) এর মাধ্যমে শনাক্তকৃত সাবমেরিনগুলোকে শিকার করার জন্য সহায়ক গ্রুপের জাহাজগুলোকে সহজেই আলাদা করে পাঠানো যেত। যেখানে নিয়মিত এস্কর্ট জাহাজগুলোকে তাদের কনভয়ের সাথে থাকতে হতো, সেখানে সহায়ক গ্রুপের জাহাজগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একটি ইউ-বোটের পিছু ধাওয়া চালিয়ে যেতে পারত। ক্যাপ্টেন জন ওয়াকার প্রবর্তিত একটি কৌশল ছিল "হোল্ড-ডাউন" (hold-down)। এই পদ্ধতিতে জাহাজের একটি দল নিমজ্জিত ইউ-বোটের ওপরে টহল দিত যতক্ষণ না তার ভেতরের বাতাস ফুরিয়ে যেত এবং তাকে ভেসে উঠতে বাধ্য করা হত; এতে দুই বা তিন দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারত।

ON 154 কনভয়ের পর জানুয়ারি মাসে শীতকালীন আবহাওয়া যুদ্ধবিরতির একটি সংক্ষিপ্ত সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩-এ SC 118 এবং ON 166 কনভয়ের সময় আবারও যুদ্ধ শুরু হয়। বসন্তকালে কনভয় যুদ্ধগুলো আগের মতোই হিংস্র রূপে ফিরে আসে। উত্তর আটলান্টিকে এত বেশি সংখ্যক ইউ-বোট টহল দিচ্ছিল যে কনভয়গুলোর পক্ষে তাদের এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল, যার ফলে একের পর এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেস ট্যাকটিক্যাল ইউনিট

[সম্পাদনা]

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৪৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ নৌ কর্মকর্তা ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেস ট্যাকটিক্যাল ইউনিটে 'ওয়ার গেম' (ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেস ট্যাকটিক্যাল ইউনিটে 'ওয়ার গেম' ছিল এক ধরনের প্রশিক্ষণমূলক মহড়া, যা জার্মান ইউ-বোটের আক্রমণ থেকে মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রক্ষার নতুন কৌশল তৈরি ও শেখানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এই গেমগুলো একটি বড় লিনোলিয়ামের মেঝেতে আঁকা গ্রিডের উপর খেলা হতো, যা 'কৌশলগত টেবিল' হিসেবে কাজ করত। কাঠের তৈরি মডেলগুলো জাহাজ এবং ইউ-বোটের প্রতিনিধিত্ব করত।) খেলেছিলেন। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, লিনোলিয়ামের মেঝেতে যে যুদ্ধ তারা করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে সমুদ্রের আসল যুদ্ধে তাদের বিজয়ের জন্য অপরিহার্য ছিল। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে, অ্যাডমিরাল হর্টন একটি ওয়ার গেমে 'বিটা সার্চ' কৌশলটি পরীক্ষা করেন। জ্যানেট ওকেল এবং জিন লেইডল এই খেলায় এসকর্টের (সাহায্যকারী জাহাজ) ভূমিকা পালন করেন। তারা দুজন ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেসের সর্বাধিনায়ক অ্যাডমিরাল হর্টনের সাবমেরিনকে পরপর পাঁচবার ডুবিয়ে দেন।

সামনের দিকে নিক্ষেপণযোগ্য অস্ত্র

[সম্পাদনা]
ডেস্ট্রয়ার এইচএমএস ওয়েস্টকটের ফোরক্যাসল-এ লাগানো হেজহগ অ্যান্টি-সাবমেরিন মর্টার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে, একটি ডুবন্ত সাবমেরিন ধ্বংস করার জন্য শুধুমাত্র ডেপথ চার্জই একমাত্র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ডেপথ চার্জগুলো দ্রুত গতিতে ছুটে চলা যুদ্ধজাহাজের পিছন দিক থেকে বা পাশ থেকে নিক্ষেপ করা হতো। প্রথম দিকের ASDIC/সোনার যন্ত্রগুলো শুধুমাত্র জাহাজের সামনে, পিছনে এবং পাশে অনুসন্ধান করতে পারত, নিচের দিকে দেখার কোনো সক্ষমতা ছিল না। এর ফলে সাবমেরিনের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করা এবং ডেপথ চার্জ নিক্ষেপের জন্য যুদ্ধজাহাজটি সেই স্থানে পৌঁছানোর মধ্যে কিছুটা বিলম্ব হতো। এর পরের ধাপে ডেপথ চার্জগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট গভীরতায় নামার সময়েও আরেকটি বিলম্ব ঘটত। এই দুটি বিরতির সুযোগে একজন দক্ষ সাবমেরিন কমান্ডার দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করে বিস্ফোরণ এড়িয়ে যেতে পারতেন। ডেপথ চার্জের বিস্ফোরণের ফলে জলরাশি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠত, যার মধ্য দিয়ে আবার ASDIC/সোনারের মাধ্যমে সাবমেরিনের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে রয়্যাল নেভি যে উপায়গুলোর উদ্ভাবন করেছিল, তার মধ্যে একটি ছিল সামনের দিকে নিক্ষেপণযোগ্য ডুবোজাহাজ-বিধ্বংসী অস্ত্র—যার প্রথমটি ছিল 'হেজহগ'।

হেজহগ

[সম্পাদনা]

হেজহগ ছিল একটি মাল্টিপল স্পিগট মর্টার, যা থেকে সংস্পর্শ-ফিউজযুক্ত (contact-fused) বোমা নিক্ষেপ করা হতো। টার্গেট সাবমেরিন যখন ASDIC বিমের মধ্যে থাকত, তখনই নিক্ষেপণকারী জাহাজের সামনে এই বোমাগুলো ছোড়া যেত। ১৯৪২ সালের শেষের দিক থেকে ডুবোজাহাজ-বিধ্বংসী জাহাজগুলোতে এটি স্থাপন করা শুরু হয়। এই অস্ত্র ব্যবহারের সময় যুদ্ধজাহাজকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে পারত (কারণ এর নিজস্ব কোনো ক্ষতি এড়ানোর জন্য বিস্ফোরিত ডেপথ চার্জের এলাকা থেকে সরে যেতে হতো না) এবং এতে শব্দও কম হওয়ায় সাবমেরিন কমান্ডারের কাছে এর অবস্থান কম স্পষ্ট হতো। হেজহগ শুধু সাবমেরিনে আঘাত করলেই বিস্ফোরিত হতো, তাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে জলের মধ্যে কোনো আলোড়ন তৈরি হতো না এবং ট্র্যাকিং জটিল হতো না—মূলত, প্রথম থেকেই সাবমেরিনের সাথে সংযোগ হারাত না।[২৮]

স্কুইড

[সম্পাদনা]

১৯৪৩ সালের শেষের দিকে স্কুইড নামের একটি নতুন অস্ত্র চালু করা হয়, যা হেজহগের উন্নত সংস্করণ ছিল। এটি ছিল তিন ব্যারেলের একটি মর্টার, যা থেকে ১০০ পাউন্ড (৪৫ কেজি) ওজনের বোমা সামনের দিকে বা পাশের দিকে নিক্ষেপ করা যেত। এই বোমাগুলোর ফায়ারিং পিস্টলগুলো নিক্ষেপের ঠিক আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেট হয়ে যেত। সবচেয়ে উন্নত সংস্করণগুলোতে স্কুইডকে নতুন ASDIC সেটের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল, যাতে অস্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিক্ষেপ করা যেত।[২৯]

লেই লাইট

[সম্পাদনা]
রয়্যাল এয়ার ফোর্স কোস্টাল কমান্ডের একটি লিবারেটরে লাগানো লেই লাইট, ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪।

রাডার-সজ্জিত বিমানের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ইউ-বোটের কার্যকলাপ দমন করা গেলেও, কেবল ভালো দৃশ্যমানতা থাকলেই বিমানের আক্রমণ সফল হতে পারত। রাতে ইউ-বোটগুলো বিমান থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল দুটি কারণে: ১) তখন ব্যবহৃত রাডার ১ মাইল (১.৬ কিমি)-এর কম দূরত্বে তাদের শনাক্ত করতে পারত না; এবং ২) আক্রমণের জন্য ব্যবহার করা ফ্লেয়ারগুলো ইউ-বোটকে সতর্ক হওয়ার এবং এড়ানোর পর্যাপ্ত সময় দিত। ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশদের লেই লাইট উদ্ভাবন এই দ্বিতীয় সমস্যার সমাধান করে এবং আটলান্টিকের যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (RAF) কর্মকর্তা এইচ. লেই-এর তৈরি এই শক্তিশালী এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য সার্চলাইটটি প্রধানত ওয়েলিংটন বোমারু বিমান এবং বি-২৪ লিবারেটর-এ লাগানো হতো। এই বিমানগুলো প্রথমে এয়ার-টু-সার্ফেস-ভেসেল (ASV) রাডারের সাহায্যে শত্রুপক্ষের সাবমেরিনের অবস্থান নির্ণয় করত। এরপর লক্ষ্যবস্তু থেকে প্রায় ১ মাইল (১.৬ কিমি) দূরে লেই লাইটটি জ্বালানো হতো। এটি সঙ্গে সঙ্গে এবং নিখুঁতভাবে শত্রুকে আলোকিত করে দিত, ফলে ইউ-বোট কমান্ডাররা ডেপথ চার্জ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার আগে মাত্র ২৫ সেকেন্ডেরও কম সময় পেতেন পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রথম নিশ্চিতভাবে ইউ-৫০০২ সাবমেরিনটিকে ১৯৪২ সালের ৫ই জুলাই ধ্বংস করা হয়।[৩০]

লেই লাইট ব্রিটিশদের রাতেও শত্রুপক্ষের সাবমেরিনকে জলের ওপর আক্রমণ করতে সক্ষম করে তোলে। এর ফলে জার্মান এবং ইতালীয় কমান্ডাররা, বিশেষ করে বিস্কে উপসাগরের সাবমেরিন ঘাঁটিতে ঢোকার সময়, জলের নিচেই থাকতে বাধ্য হন। যারা এই আক্রমণ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন, সেই ইউ-বোট কমান্ডাররা এই অস্ত্রটির প্রতি তাদের বিশেষ ভীতির কথা জানিয়েছেন।[৩০] কারণ, রাতে বিমান দেখা যেত না এবং সাবমেরিনের ইঞ্জিনের শব্দের কারণে কাছে আসা বিমানের শব্দও শোনা যেত না। ব্যাটারি চার্জ করার এবং বাতাস বিশুদ্ধ করার জন্য রাতে জলের ওপর ভেসে ওঠার যে সাধারণ অভ্যাস ছিল, তা বেশিরভাগই ত্যাগ করা হয়। কারণ, দিনের বেলায় শত্রুপক্ষের বিমান দেখা গেলে এই কাজগুলো করা আরও নিরাপদ মনে হতো।

মেটক্স রিসিভার

[সম্পাদনা]
স্লোপ এইচএমএস স্টারলিং-এর পিছনের দিকে ডেপথ চার্জ বিস্ফোরিত হচ্ছে। এটি যুদ্ধের সময় ১৪টি সাবমেরিন ডুবিয়ে দিতে সহায়তা করেছিল।

১৯৪২ সালের আগস্ট মাস নাগাদ, ইউ-বোটগুলোতে রাডার ডিটেক্টর বসানো হচ্ছিল, যাতে রাডার-সজ্জিত বিমান বা জাহাজের অতর্কিত আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। প্রথম যে রিসিভারটি তৈরি হয়েছিল, তার ফরাসি নির্মাতার নামানুসারে এর নাম দেওয়া হয়েছিল মেটক্স। এটি প্রাথমিক রাডারগুলোতে ব্যবহৃত মেট্রিক রাডার ব্যান্ডগুলো শনাক্ত করতে পারত। এর ফলে ইউ-বোটগুলো সেকেলে রাডার সেট দিয়ে সজ্জিত কানাডীয় এসকর্টগুলোর নজর এড়াতে পারত এবং যেসব কনভয়ে এই ধরনের রাডার ব্যবহার করা হতো, সেগুলোর অবস্থানও ট্র্যাক করতে পারত।

তবে এটি জার্মানদের জন্যও কিছু সমস্যা সৃষ্টি করত। কখনো কখনো এটি দূরের কোনো জাহাজ বা বিমানের বিচ্ছিন্ন রাডার সিগনালও ধরে ফেলত। এর ফলে ইউ-বোটগুলো কোনো বিপদ না থাকলেও জলের নিচে চলে যেত। এতে তাদের ব্যাটারি চার্জ করার বা জলের উপরে থাকার দ্রুত গতি ব্যবহার করার সুযোগ নষ্ট হতো।

মেটক্স ইউ-বোট কমান্ডারদের এমন একটি সুবিধা দিয়েছিল, যা ব্রিটিশরা আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি। শিকারি বিমানের রাডারের পালস রেটের সঙ্গে মিলিয়ে মেটক্স সেটটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় একবার 'বিপ' শব্দ করত। যখন রাডার অপারেটর ইউ-বোটের ৯ মাইল (১৪ কিমি) কাছাকাছি আসত, তখন সে তার রাডারের রেঞ্জ পরিবর্তন করত। রেঞ্জ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাডারের পালস ফ্রিকোয়েন্সি দ্বিগুণ হয়ে যেত এবং এর ফলস্বরূপ মেটক্সের 'বিপ' শব্দের ফ্রিকোয়েন্সিও দ্বিগুণ হয়ে যেত। এটি কমান্ডারকে সতর্ক করত যে তাকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং কাছে আসা বিমানটি ৯ মাইল দূরে আছে।

জার্মানরা অ্যাডমিরালটি কোড ভাঙে

[সম্পাদনা]

১৯৪১ সালে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা রিয়ার অ্যাডমিরাল জন হেনরি গডফ্রেকে জানায় যে, যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর কোড ভাঙা সম্ভব। ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে জার্মানরা নেভাল সাইফার ৩ ভেঙে ফেলে, যা মার্কিন-ব্রিটিশ যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো। ১৯৪২ সালের মার্চ থেকে ১৯৪৩ সালের জুন পর্যন্ত অ্যাডমিরালটির (ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রশাসনিক সংস্থা বা বিভাগকে বোঝায়, যা নৌবাহিনীর কার্যক্রম, নীতি, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যুক্তরাজ্যের অ্যাডমিরালটি ছিল নৌবাহিনীর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, যারা নৌ-কৌশল, যোগাযোগ কোড, এবং কনভয় পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তদারকি করত।) ৮০ শতাংশ বার্তা জার্মানরা পড়তে সক্ষম হয়। এর ফলে মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবির হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

অ্যাডমিরাল ডনিৎজের জামাতা এবং ইউ-বোট কমান্ডের প্রথম স্টাফ অফিসার গুন্টার হেসলার বলেন, “আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম যখন ব্রিটিশ রেডিও বার্তা ডিক্রিপ্ট করতে এক থেকে দুই দিন সময় লাগত। কখনো কখনো মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এটি সম্ভব হতো। আমরা মাঝেমধ্যে অনুমান করতে পারতাম কখন এবং কীভাবে তারা আমাদের ইউ-বোট বিন্যাসের ফাঁকফোকর দিয়ে সুবিধা নেবে। আমাদের কাজ ছিল কনভয়গুলো আসার ঠিক আগে সেই ফাঁকগুলো বন্ধ করা।”[৩১] ব্লেচলি পার্কের কোড ভাঙার দল মাত্র দুজনকে নিয়োগ করে জার্মানরা কোড ভেঙেছে কিনা তা যাচাই করার জন্য। পাঁচ মাস পর তারা নিশ্চিত করে যে কোডগুলো ভাঙা হয়েছে। ১৯৪২ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যের অ্যাডমিরালটিকে এ বিষয়ে জানানো হয়, কিন্তু তারা ১৯৪৩ সালের জুন পর্যন্ত কোড পরিবর্তন করে না।

ক্যাপ্টেন রেমন্ড ড্রেয়ার, লিভারপুলে অবস্থিত অ্যাটলান্টিক যুদ্ধের ব্রিটিশ সদর দপ্তর ওয়েস্টার্ন অ্যাপ্রোচেসের ডেপুটি স্টাফ সিগন্যালস অফিসার, বলেন, “তাদের কিছু সবচেয়ে সফল ইউ-বোট প্যাক আক্রমণ আমাদের কনভয়গুলোর ওপর ভিত্তি করেছিল আমাদের সাইফার ভাঙার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের উপর।”[৩২]

১৯৪২ সালে এনিগমা

[সম্পাদনা]

১৯৪২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি Kriegsmarine (জার্মান নৌবাহিনী) ইউ-বোটগুলোর জন্য 'TRITON' নামে একটি নতুন এনিগমা নেটওয়ার্ক চালু করে, যেখানে নতুন চার-রোটর বিশিষ্ট এনিগমা মেশিন ব্যবহার করা হতো। কোড ব্রেকাররা এই নতুন কোডটি পড়তে পারছিল না, যার ফলে মিত্রশক্তি আর ইউ-বোটের টহল দেওয়ার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারত না। এতে ইউ-বোটকে এড়িয়ে চলা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল এবং 'উলফ প্যাক'গুলো একের পর এক কনভয় ধ্বংস করে দিচ্ছিল। এই পরিস্থিতি দশ মাস ধরে চলেছিল। সাবমেরিনের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পেতে মিত্রশক্তিকে HF/DF ফিক্স এবং পুরোনো এনিগমা মেশিনে এনকোড করা Kriegsmarine-এর বার্তার উপর নির্ভর করতে হচ্ছিল। এই বার্তাগুলোর মধ্যে ছিল উপকূলীয় বাহিনীর পাঠানো ইউ-বোটের আগমন ও প্রস্থানের খবর এবং ইউ-বোট প্রশিক্ষণ কমান্ডের রিপোর্ট। এই সূত্রগুলো থেকে কমান্ডার রজার উইনের অ্যাডমিরালটি সাবমেরিন ট্র্যাকিং রুম সাবমেরিনের গতিবিধি অনুমান করত, কিন্তু এই তথ্য পর্যাপ্ত ছিল না।

৩০শে অক্টোবর, এইচ.এম.এস. পেটার্ড-এর ক্রু সদস্যরা সাইদ বন্দরের কাছে ডুবে যাওয়া জার্মান সাবমেরিন U-559 থেকে এনিগমার সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এর ফলে কোড ব্রেকাররা 'TRITON' কোডটি ভাঙতে সক্ষম হয়। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আবার এনিগমা ডিক্রিপ্ট থেকে ইউ-বোটের টহল দেওয়ার অবস্থানগুলো জানা যাচ্ছিল এবং এর ফলস্বরূপ জাহাজডুবির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসে।

যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্ত (মার্চ–মে ১৯৪৩, "ব্ল্যাক মে")

[সম্পাদনা]

১৯৪৩ সালের ১০ই মার্চ জার্মানরা ইউ-বোটের এনিগমা কোডে একটি নতুন পরিবর্তন আনে, যার ফলে ব্লেচলি পার্কের মিত্রশক্তির কোড ব্রেকাররা ৯ দিনের জন্য সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে পড়ে। ওই মাসে ইউজিএস ৬, এইচএক্স ২২৮, এসসি ১২১, এসসি ১২২ এবং এইচএক্স ২২৯—এই কনভয়গুলোর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সারা বিশ্বে মোট ১২০টি জাহাজডুবি হয়, যার মধ্যে শুধুমাত্র আটলান্টিক মহাসাগরেই ৪,৭৬,০০০ টন ওজনের ৮২টি জাহাজ ডুবেছিল। বিপরীতে, মাত্র ১২টি ইউ-বোট ধ্বংস হয়েছিল।

সেই সময় ব্রিটেনের সরবরাহ পরিস্থিতি এতটাই খারাপ ছিল যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে কি না তা নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়। বিশেষত জ্বালানির সরবরাহ ছিল খুবই কম। অবস্থা এতই শোচনীয় ছিল যে ব্রিটিশরা কনভয় ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু পরের দুই মাসেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।

এপ্রিল মাসে ইউ-বোটের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তাদের দ্বারা জাহাজডুবির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। আটলান্টিকে মাত্র ৩৯টি জাহাজ ডুবেছিল, যার মোট ওজন ছিল ২,৩৫,০০০ টন, এবং ১৫টি ইউ-বোট ধ্বংস হয়েছিল। মে মাস নাগাদ 'উলফ প্যাক'গুলো তাদের সুবিধা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে এবং এই মাসটি ইউ-বোট আর্মের কাছে 'ব্ল্যাক মে' (Black May) নামে পরিচিত হয়। ধীর গতির কনভয় 'ওএনএস ৫'-এর (এপ্রিল-মে ১৯৪৩) যুদ্ধটি ছিল এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৬টি যুদ্ধজাহাজের পাহারায় ৪৩টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়ে গঠিত এই কনভয়টি ৩০টি ইউ-বোটের একটি প্যাকের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। এই যুদ্ধে ১৩টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে গেলেও, এসকর্ট জাহাজ বা মিত্রশক্তির বিমানের আক্রমণে ছয়টি ইউ-বোট ধ্বংস হয়েছিল। ঝড়ের কারণে কনভয়টি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো শেষ পর্যন্ত স্থলভিত্তিক বিমান সুরক্ষার আওতায় চলে আসে, যার ফলে অ্যাডমিরাল ডোনিৎস আক্রমণ বন্ধ করতে বাধ্য হন। এর দুই সপ্তাহ পর 'এসসি ১৩০' নামের আরেকটি কনভয়ের যুদ্ধে কোনো ক্ষতি ছাড়াই কমপক্ষে তিনটি ইউ-বোট ধ্বংস হয় এবং অন্তত একটি ইউ-বোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন বিপর্যয়ের মুখে ডোনিৎস উত্তর আটলান্টিকে অপারেশন বন্ধ করে দেন এবং স্বীকার করেন যে, "আমরা আটলান্টিকের যুদ্ধে হেরে গেছি।"

একটি ভিকার্স ওয়েলিংটন, যার থুতনির নিচে একটি এএসভি থ্রি রাডার এবং পেটের নিচে একটি লেই লাইট লাগানো আছে।

১৩ই এপ্রিল আরএএফ কোস্টাল কমান্ড 'অপারেশন ডিরেঞ্জ' দিয়ে তাদের দ্বিতীয় বে অফেনসিভ শুরু করে। নতুন সেন্টিমেট্রিক এএসভি মার্ক III রাডার এবং পিপিআই ডিসপ্লে-তে সজ্জিত ৭৫টি দূরপাল্লার বিমান বিস্কে উপসাগরের সেইসব অঞ্চলে টহল দেওয়া শুরু করে, যেখানে এনিগমা ডিক্রিপ্ট থেকে জানা গিয়েছিল যে ইউ-বোটগুলো যাতায়াত করছে। জার্মান মেটক্স রাডার ডিটেক্টর শুধুমাত্র মেট্রিক ব্যান্ডে কাজ করত, তাই নতুন সেন্টিমেট্রিক রাডার নির্গমন শনাক্ত করতে পারত না। এর ফলস্বরূপ, অনেক ইউ-বোট অপ্রত্যাশিতভাবে আক্রমণের শিকার হয়। এর জবাবে ডোনিৎস ইউ-বোটগুলোকে জলের উপরে থেকে সরাসরি বিমানের সাথে লড়াই করার নির্দেশ দেন। কিছু ইউ-বোটকে অতিরিক্ত এবং নতুন অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট গান দিয়ে 'ফ্ল্যাক বোট'-এ রূপান্তরিত করা হলেও তাতে কোনো লাভ হয়নি। মে মাসে পাঁচটি ইউ-বোট ডুবে যায় এবং আরও সাতটি তাদের মিশন বাতিল করতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে, মে মাসে মোট ৪৩টি ইউ-বোট ধ্বংস হয়েছিল, যার মধ্যে ৩৪টি ছিল আটলান্টিকে। এটি ছিল ইউ-বোট আর্মের মোট কর্মক্ষম শক্তির ২৫ শতাংশ। একই সময়ে মিত্রশক্তির ৫৮টি জাহাজ ডুবেছিল, যার মধ্যে ৩৪টি (মোট ১,৩৪,০০০ টন) আটলান্টিকে ছিল।

প্রযুক্তির সমন্বয়

[সম্পাদনা]

মিত্রশক্তি মাত্র দুই মাসের মধ্যে আটলান্টিকের যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। এর পেছনে কোনো একটি একক কারণ ছিল না; বরং প্রযুক্তি এবং মিত্রশক্তির সম্পদের হঠাৎ সমন্বয়ই এই সাফল্যের মূল কারণ ছিল। এতদিন বিমানের নাগালের বাইরে থাকা মধ্য-আটলান্টিকের ফাঁকটি এবার দূরপাল্লার বি-২৪ লিবারেটর বিমানের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৩ সালের ১৮ই মার্চ রুজভেল্ট তার সামরিক কমান্ডারদের দেওয়া দুটি সরাসরি নির্দেশের মধ্যে একটিতে (অন্যটি ছিল অপারেশন টর্চ সম্পর্কিত)[৩৩] কিং-কে ৬০টি লিবারেটর বিমান প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আটলান্টিকে জার্মান ইউ-বোটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দেন। ১৯৪৩ সালের মে মাসে ত্রিদন্ত (Trident) সম্মেলনে, অ্যাডমিরাল কিং জেনারেল হেনরি এইচ. আর্নল্ডকে উত্তর আটলান্টিকের কনভয়গুলোর বিমান নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অ্যান্টি-সাবমেরিন যুদ্ধ (ASW)-এর জন্য তৈরি একটি বি-২৪ স্কোয়াড্রন নিউফাউন্ডল্যান্ডে পাঠানোর অনুরোধ করেন। জেনারেল আর্নল্ড তাঁর স্কোয়াড্রন অধিনায়ককে নির্দেশ দেন যে শুধুমাত্র "আক্রমণাত্মক" সন্ধান ও আক্রমণ অভিযান চালাতে হবে, কনভয় রক্ষার কাজে নয়। জুন মাসে, জেনারেল আর্নল্ড প্রস্তাব দেন যে নৌবাহিনী যেন জলসীমা রক্ষার (এএসডব্লিউ) অভিযানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। অ্যাডমিরাল কিং তখন সমপরিমাণ অপরিবর্তিত (সাধারণ) নৌবাহিনীর বি-টোয়েন্টি ফোর (B-24) বিমানের বিনিময়ে সেনাবাহিনীর জলসীমা রক্ষার উপযোগে তৈরি বি-টোয়েন্টি ফোর বিমান চান। জুলাই মাসে এই বিষয়ে চুক্তি হয় এবং ১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিমান বিনিময় সম্পন্ন হয়।[৩৪]

দক্ষিণ আটলান্টিকে ব্রাজিলের উত্তর উপকূলের কাছে, ইউএস নেভির পেট্রোল স্কোয়াড্রন ভিপি-৮৩-এর একটি কনসোলিডেটেড পিবিওয়াই-৫এ ক্যাটালিনা দ্বারা আক্রমণের শিকার ইউ-৫০৭।

মার্চেন্ট এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার (MAC ships)-এর অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আরও অতিরিক্ত বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়। এই জাহাজগুলো ফেয়ারি সোর্ডফিশ বিমান বহন করত। যদিও এই সোর্ডফিশগুলো কোনো ইউ-বোট ডুবিয়ে দিতে পারেনি, তবুও তাদের উপস্থিতি ইউ-বোটের আক্রমণ প্রতিরোধ করত বা তাদের হটিয়ে দিত। এর পাশাপাশি তা বাণিজ্যিক নৌবাহিনীর মনোবলও বাড়িয়েছিল। এরপর আমেরিকান-নির্মিত এসকর্ট ক্যারিয়ারের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যেগুলোতে প্রধানত গ্রুম্যান এফ৪এফ ওয়াইল্ডক্যাট এবং গ্রুম্যান টিবিএফ অ্যাভেঞ্জার বিমান থাকত। উভয় ধরনের ক্যারিয়ারই কনভয়গুলোর সঙ্গে চলত এবং পুরো আটলান্টিক জুড়ে প্রয়োজনীয় বিমান নিরাপত্তা ও টহল দিত। এছাড়া এসকর্ট ক্যারিয়ারগুলো প্রায়ই হান্টার-কিলার দল গঠন করত, যা কোনো কনভয়ের সঙ্গে যুক্ত না থেকে স্বাধীনভাবে ইউ-বোট খুঁজে বের করত।[৩৫]

মিত্রশক্তির কাছে আরও বেশি সংখ্যক এসকর্ট জাহাজ সহজলভ্য হয়েছিল, যার কারণ ছিল একদিকে আমেরিকান জাহাজ নির্মাণ কর্মসূচি, এবং অন্যদিকে ১৯৪২ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে উত্তর আফ্রিকায় সেনা নামানোর জন্য ব্যবহৃত এসকর্টগুলোকে মুক্ত করে আনা। বিশেষ করে ডেস্ট্রয়ার এসকর্ট (DEs), (ব্রিটিশরা একই ধরনের জাহাজকে ফ্রিগেট বলত) এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যেন তা কম খরচে তৈরি করা যায়। এর বিপরীতে বহরের ডেস্ট্রয়ার এবং স্লোপ-এর যুদ্ধজাহাজ-মানসম্পন্ন নির্মাণ ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কারণে সেগুলোর ব্যাপক উৎপাদন ব্যয়বহুল ছিল। ডেস্ট্রয়ার এসকর্ট এবং ফ্রিগেটগুলো মধ্য-সমুদ্রে ডুবোজাহাজ-বিরোধী যুদ্ধের জন্য কর্ভেটের চেয়েও ভালোভাবে তৈরি করা হয়েছিল। যদিও কর্ভেটগুলো সহজে ম্যানুভর করা যেত এবং সমুদ্রোপযোগী ছিল, তবুও তারা ডেস্ট্রয়ার এসকর্টগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছোট, ধীর এবং অপ্রতুলভাবে সজ্জিত ছিল। কেবল কনভয়গুলো নিরাপদে রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক এসকর্ট জাহাজই ছিল না, তারা হান্টার-কিলার দলও গঠন করতে পারত (প্রায়শই এসকর্ট ক্যারিয়ারকে কেন্দ্র করে), যারা আগ্রাসীভাবে ইউ-বোটের খোঁজে বের হত।

১৯৪৩ সালের মে মাসে, মার্কিন নৌবাহিনী নিজস্ব নকশার একটি উচ্চ-গতির 'বোম্ব' ব্যবহার করা শুরু করে, যা নতুন চার-রোটর বিশিষ্ট জার্মান এনিগমা সাইফার মেশিনের সেটিংস বের করতে পারত। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ, ১২১টি নতুন উচ্চ-গতির বোম্ব কাজ করছিল।

এই 'টনজ ওয়ার'-এ ডোনিৎসের লক্ষ্য ছিল, মিত্রশক্তির জাহাজগুলো যত দ্রুত প্রতিস্থাপিত হতে পারে, তার চেয়েও দ্রুত সেগুলোকে ডুবিয়ে দেওয়া। কিন্তু যখন জাহাজডুবির সংখ্যা কমে যায় এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বেড়ে যায়, তখন এই লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দক্ষিণ আটলান্টিক (মে ১৯৪২ – সেপ্টেম্বর ১৯৪৩)

[সম্পাদনা]
১৯৪৪ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকে সাবমেরিন-বিরোধী যুদ্ধে ব্রাজিলীয় নৌবাহিনী।

১৯৪০ সালের শেষের দিকে দক্ষিণ আটলান্টিকে (বিশেষ করে ব্রাজিল এবং পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথে) জার্মানির ইউ-বোটের আনাগোনা শুরু হলেও, পরের বছর থেকে এই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম ওয়াশিংটনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের উপকূল বরাবর নিজেদের সামরিক শক্তি মোতায়েনের কথা বিবেচনা করে। ব্রাজিলের তৎকালীন শাসক গেতুলিও ভার্গাসের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসওয়াল্ডো আরানহার সাথে আলোচনার পর, ১৯৪১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এটি বাস্তবায়িত হয়।[৩৬]

এর ফলস্বরূপ, জার্মানি এবং ইতালি তাদের সাবমেরিন হামলা ব্রাজিলীয় জাহাজগুলোর ওপরও শুরু করে এবং ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাস থেকে তারা ব্রাজিলের জলসীমায়ও চলে আসে। ১৯৪২ সালের ২২শে মে, ইতালীয় সাবমেরিন বার্বারিজোর ওপর ব্রাজিলীয় বিমান বাহিনী প্রথম হামলা চালায়, যদিও তা সফল হয়নি।[৩৬] এরপর ইউ-৫০৭ নামের একটি সাবমেরিন ব্রাজিলের উপকূলে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করলে, ১৯৪২ সালের ২২শে আগস্ট ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়। এটি দক্ষিণ আটলান্টিকের মিত্রশক্তির কৌশলগত অবস্থানে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল।[৩৭]

যদিও ব্রাজিলীয় নৌবাহিনী আকারে ছোট ছিল, তাদের কাছে আধুনিক মাইনলেয়ার ছিল যা উপকূলীয় কনভয় এসকর্টের জন্য উপযুক্ত ছিল। এছাড়া, তাদের বিমানগুলো সামান্য পরিবর্তন করেই সামুদ্রিক টহলের জন্য ব্যবহার করা যেত। তিন বছরের যুদ্ধে, ব্রাজিল মূলত ক্যারিবিয়ান এবং দক্ষিণ আটলান্টিক অঞ্চলে একা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে মোট ৬১৪টি কনভয়ে ৩,১৬৭টি জাহাজকে এসকর্ট করে, যার মোট ওজন ছিল ১ কোটি ৬৫ লক্ষ টন।[৩৮] এতে তাদের ক্ষতির হার ছিল মাত্র ০.১%। শত্রু সাবমেরিনের হামলায় মোট ৩২টি ব্রাজিলীয় বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যায় এবং এর ফলে ৯৭২ জন নাবিক ও বেসামরিক যাত্রী প্রাণ হারান। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত মার্কিন ও ব্রাজিলীয় বিমান এবং নৌবাহিনী ঘনিষ্ঠভাবে একসাথে কাজ করে।.[৩৯][৪০] এর একটি উদাহরণ হলো ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে ইউ-১৯৯ সাবমেরিনটিকে ডুবিয়ে দেওয়া। এটি ব্রাজিলীয় ও মার্কিন বিমানের একটি সমন্বিত হামলার ফল ছিল। ১৯৪৩ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ব্রাজিলের জলসীমায় আরও এগারোটি অক্ষশক্তির সাবমেরিন ডুবে যায়—এর মধ্যে একটি ইতালীয় (আর্কিমিডে) এবং দশটি জার্মান সাবমেরিন ছিল: ইউ-১২৮, ইউ-১৬১, ইউ-১৬৪, ইউ-৫০৭, ইউ-৫১৩, ইউ-৫৯০, ইউ-৫৯১, ইউ-৫৯৮, ইউ-৬০৪ এবং ইউ-৬৬২।[৪০][৪১][৪২]

১৯৪৩ সালের শেষের দিকে দক্ষিণ আটলান্টিকে মিত্রশক্তির জাহাজ হারানোর সংখ্যা কমে আসে এবং একই সময়ে অক্ষশক্তির সাবমেরিনগুলোও এই অঞ্চল থেকে ক্রমশ নির্মূল হতে থাকে। এর পর থেকেই জার্মানি এই অঞ্চলের যুদ্ধে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারায়, যদিও বেশিরভাগ অবশিষ্ট সাবমেরিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৪ সালের আগস্ট মাসে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক জাহাজ ব্যারন জেডবার্গ ১৯৪৫ সালের ১০ই মার্চ ইউ-৫৩২ সাবমেরিনের হামলায় ডুবে যায়।[৪৩]

শেষ বছরগুলো (জুন ১৯৪৩ – মে ১৯৪৫)

[সম্পাদনা]

উত্তর আটলান্টিকের কনভয় রুটে পরাজয়ের পর অ্যাডমিরাল ডোনিৎজ এবং হিটলারের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে নতুন প্রজন্মের ইউ-বোটের খুব জরুরি প্রয়োজন। বিপ্লবী হাইড্রোজেন পারক্সাইড চালিত, বাতাস-নিরপেক্ষ প্রপেলান্ট সিস্টেমের মাধ্যমে উচ্চ গতিতে চলতে সক্ষম ওয়াল্টার ইউ-বোট তৈরির একটি কর্মসূচি ছিল। কিন্তু এটি অনেক কারিগরি সমস্যার মুখোমুখি হয় এবং সময় মতো সেগুলোর উৎপাদন সম্ভব হয়নি। এর পরিবর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এই নকশাগুলোই পরিবর্তন করা হবে; নতুন প্রপেলান্ট সিস্টেমের বদলে প্রচলিত ইউ-বোট প্রপেলান্ট সিস্টেমের জন্য অনেক বড় ব্যাটারি ক্ষমতা ব্যবহার করা হবে। এগুলোর নাম দেওয়া হয় 'ইলেক্ট্রোবোট' টাইপ। যেহেতু নকশা তৈরি ছিল, আশা করা হয়েছিল যে এই নতুন টাইপ XXI (মহাসাগরগামী) এবং টাইপ XXIII (উপকূলীয়) ইউ-বোটগুলো প্রাক-নির্মিত অংশ দিয়ে ব্যাপক হারে উৎপাদন করে ১৯৪৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে চালু করা যাবে। এর মধ্যে, ইলেক্ট্রোবোটগুলো আসা পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যমান ইউ-বোটগুলোকে ধীরে ধীরে 'শনরকেল' (snorkel) দিয়ে সজ্জিত করা হয়। এটি ইউ-বোটগুলোকে ডুবন্ত অবস্থায় তাদের ডিজেল ইঞ্জিন চালাতে এবং ব্যাটারি রিচার্জ করতে সাহায্য করত।[৪৪]

এসকর্ট ক্যারিয়ার ইউএসএস বোগ।

ইউ-বোটগুলো উত্তর আটলান্টিকের কনভয় রুট ছেড়ে মধ্য আটলান্টিকের আমেরিকান-ভূমধ্যসাগরীয় কনভয়গুলোর ওপর হামলা শুরু করে। মিত্রশক্তি গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে এই পরিবর্তন জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী তিনটি মার্কিন নৌ টাস্ক গ্রুপ (যেগুলোর কেন্দ্রে ছিল কার্ড, বোগ এবং স্যান্টি নামক এসকর্ট ক্যারিয়ার) ঐ অঞ্চলে পাঠায়। এই এসকর্ট ক্যারিয়ারগুলো কনভয়গুলোকে সুরক্ষা দিত, তবে সেগুলো কনভয়ের একদম কাছে থাকত না, বরং হাই ফ্রিকোয়েন্সি/ডাইরেকশন ফাইন্ডিং (HF/DF) এর মাধ্যমে ইউ-বোট এবং তাদের সহায়তাকারী ট্যাংকারগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করার অনুমতি ছিল। এতে মাত্র ১টি জাহাজ হারিয়েছিল, কিন্তু এসকর্ট ক্যারিয়ারগুলো ১৭টি ইউ-বোট ডুবিয়ে দেয়। এই পরাজয়ের পর ডোনিৎজ আগস্টের শুরুতে সব 'উলফপ্যাক' অপারেশন বন্ধ করে দেন, যতক্ষণ না ইউ-বোটগুলোকে আরও ভালো অস্ত্র ও অন্যান্য ব্যবস্থা দিয়ে উন্নত করা যায়। একই সময়ে, ব্রিটিশরা পর্তুগালের অ্যাজোরস দ্বীপপুঞ্জের বন্দরগুলো ব্যবহার করার অনুমতি পায় এবং মিত্রশক্তির সামরিক বিমানগুলো সেখান থেকে কার্যক্রম চালাতে শুরু করে। এর ফলে মধ্য আটলান্টিকের 'এয়ার গ্যাপ' বন্ধ হয়ে যায় এবং ঐ অঞ্চলে অপারেশন চালানো সমান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৩ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উপকূলীয় কমান্ড বে অফেনসিভ চালিয়ে যায়, যার অংশ হিসেবে অপারেশন মাস্কেট্রি, সীস্লাগ এবং পারকাশন চালানো হয়। আগস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বিস্কে উপসাগরে বেশ কয়েকটি ইউ-বোট ডুবে যায়। 'বে অফেনসিভ' আরও জোরদার করা হয় সেখানে এসকর্ট ও সাপোর্ট গ্রুপ পাঠিয়ে। কিন্তু এই জাহাজগুলো জার্মান ডরনিয়ার ডো ২১৭ বিমান দ্বারা বিতাড়িত হয়, যেগুলোতে হেন্সেল এইচএস ২৯৩ নামক নিয়ন্ত্রিত গ্লাইড বোমা লাগানো ছিল এবং এর ফলে বেশ কিছু মিত্রশক্তির জাহাজ ধ্বংস হয়।

১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বরে ডোনিৎজ 'উলফপ্যাক লুইথেন'কে উত্তর আটলান্টিকের কনভয় রুটে ফিরিয়ে এনে মিত্রশক্তিকে অবাক করার আশা করেছিলেন। এই ইউ-বোটগুলো টি৫ "জাউনকনিগ" অ্যাকোস্টিক টর্পেডো, উন্নত বিমান-বিধ্বংসী কামান, একটি নতুন "ওয়ানজে" রাডার ডিটেক্টর এবং "অ্যাফ্রোডাইট" রাডার ডিকয় দিয়ে সজ্জিত ছিল। তাদের 'উলফপ্যাক' কৌশলে পরিবর্তন এনে প্রথমে কনভয়ের এসকর্ট জাহাজগুলোতে অ্যাকোস্টিক টর্পেডো দিয়ে হামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তারপর বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে আক্রমণ করতে বলা হয়। কনভয় ওএনএস ১৮ এবং ওএন ২০২-এর ওপর প্রথম হামলায় এই গ্রুপটি চমক ও সফলতা পায়, কিন্তু এর পরের সব হামলা প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং জার্মানদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। উলফপ্যাক রসবাখ', 'শ্লিফেন এবং সিগফ্রিড নামের আরও কিছু দল গঠন করা হয় এবং নতুন এই অভিযান চালিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু ব্যাপক ক্ষতির বিনিময়ে তারা সামান্যই সফলতা পায়। ৩৯টি ইউ-বোট হারানোর বিনিময়ে মাত্র আটটি জাহাজ (মোট ৫৬,০০০ টন) এবং ছয়টি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়েছিল, যা ছিল এক বিপর্যয়কর ক্ষতির অনুপাত। নভেম্বরে ডোনিৎজ অবশেষে বুঝতে পারেন যে ভারী কনভয় এসকর্টের মুখে 'উলফপ্যাক' হামলা আর কার্যকর নয় এবং তিনি তার ইউ-বোটগুলোকে ছড়িয়ে দেন।

একটি টাইপ ফোরটিন সাপ্লাই সাবমেরিন (যা "মিল্ক কাউ" নামে পরিচিত) ইউ-৪৫৯, একটি ভিকার্স ওয়েলিংটনের আক্রমণে ডুবে যাচ্ছে।

১৯৪৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডোনিৎজ তার ইউ-বোটের শক্তি সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেন, যাতে নরওয়ে এবং ফ্রান্সে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। তার আটলান্টিক ইউ-বোটের টহল সংখ্যা জানুয়ারিতে ৪১ থেকে মে মাসে ১০-এ নেমে আসে। যেহেতু ইউ-বোটগুলোকে তখনো ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হচ্ছিল অথবা নরওয়েতে সংরক্ষিত রাখা হচ্ছিল এবং কর্মকালীন ক্ষয়ক্ষতিও বেশি ছিল, তাই আটলান্টিক ফোর্সে উপলব্ধ ইউ-বোটের সংখ্যা একই সময়ে ১২১ থেকে ৮৯-এ নেমে আসে। ডোনিৎজ আশা করেছিলেন যে ইলেক্ট্রোবোটগুলো ১৯৪৪ সালে কনভয় রুটগুলোতে আবার আক্রমণ শুরু করতে পারবে, কিন্তু দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং মিত্রশক্তির বোমা হামলায় শিপইয়ার্ড ও ইউ-বোট ইঞ্জিন ফ্যাক্টরিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এগুলোর নির্মাণ কাজ বিলম্বিত হয়। ১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম টাইপ XXI চালু হয়, কিন্তু এর ডুবন্ত অবস্থায় গতি এবং গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা নকশার চেয়ে খারাপ প্রমাণিত হয়।[৪৫]

নরম্যান্ডি অবতরণের দিনে আটলান্টিকের সব অপারেশন স্থগিত করা হয় এবং উপলব্ধ ৩৬টি ইউ-বোটকে (পরে আরও সাতটি দিয়ে শক্তিশালী করা হয়) অপারেশন নেপচুন-এর বিরুদ্ধে পাঠানো হয়। নিজেদের ১৩টি ইউ-বোট হারানোর বিনিময়ে তারা নরম্যান্ডি আক্রমণে অংশ নেওয়া ৫,৩৩৯টি জাহাজের মধ্যে মাত্র আটটিকে ডুবিয়েছিল। মিত্রশক্তির বিমান টহল এমন ইউ-বোটগুলোর জন্য অপারেশন চালানো অসম্ভব করে তুলেছিল যেগুলোতে শনরকেল ছিল না, এবং সেগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল। আক্রমণের দ্বিতীয় সপ্তাহে নরওয়ে থেকে আরও এগারোটি শনরকেল ইউ-বোট এসে পৌঁছায়, কিন্তু তারা সাতটি ইউ-বোট হারানোর বিনিময়ে মাত্র দুটি জাহাজ ডুবিয়েছিল। ফ্রান্সে মিত্রশক্তির অগ্রগতির কারণে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ব্রেস্ট এবং বোর্দো-র ইউ-বোট ঘাঁটিগুলো হাতছাড়া হয়। লোরিয়েন্ট, সেন্ট-নাজাইর এবং লা পালিসে থাকা বাকি তিনটি ঘাঁটি খালি করে দেওয়া হলেও যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেগুলো জার্মানির হাতেই ছিল। এই ঘাঁটিগুলো থেকে কোনো অভিযান চালানো সম্ভব ছিল না এবং অবশিষ্ট ৩০টি ইউ-বোটকে নরওয়েতে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৬ই মে থেকে ১লা নভেম্বরের মধ্যে ৭২টি ইউ-বোট হারিয়েছিল, অথচ তারা মাত্র ১২টি ছোট যুদ্ধজাহাজ এবং ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ (৬০,০০০ টন) ডুবিয়েছিল।[৪৬]

নরওয়ে কনভয় রুট থেকে অনেক দূরে ছিল, তাই শনরকেল ইউ-বোট দিয়ে দলবদ্ধ হামলা চালানো সম্ভব ছিল না। ইলেক্ট্রোবোটগুলো আসা পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯৪৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নরওয়ে থেকে ব্রিটিশ জলসীমার দিকে ৬৮টি টহল পরিচালনা করা হয়। শুধুমাত্র শনরকেল-সজ্জিত টাইপ VII ইউ-বোটগুলো ব্যবহার করা যেত, কারণ মিত্রশক্তির বিমান শ্রেষ্ঠত্বের কারণে পানির উপরে ক্রমাগত চলাচল করা সম্ভব ছিল না। এতে ১৬টি ইউ-বোট হারিয়েছিল। একই সময়ে, দীর্ঘ পাল্লার টাইপ IX ইউ-বোটগুলোর সতেরোটিকে কানাডা এবং অ্যাজোরসের দিকে পাঠানো হয়। এই ইউ-বোটগুলোতেও শনরকেল ছিল এবং নতুন প্রযুক্তি যেমন ফ্লিগে এবং মুকে রাডার ডিটেক্টর ও একটি নতুন হোহেন্টউইল সার্চ রাডার ছিল। তারা সাতটি ইউ-বোট হারানোর বিনিময়ে ছয়টি যুদ্ধজাহাজ এবং নয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়েছিল।

১৯৪৫ সালে ডোনিৎজ একই কৌশল চালিয়ে যান: টাইপ VII শনরকেল ইউ-বোটগুলো নরওয়ে এবং জার্মানি থেকে ব্রিটিশ জলসীমায় ১১৩টি টহল দেয়। যুদ্ধের শেষ নাগাদ ৬৫টি ইউ-বোট হারিয়েছিল। আরও উনিশটি টাইপ IX ইউ-বোট আমেরিকার দিকে যাত্রা করে; এই ইউ-বোটগুলো নিজেদের নয়টি হারানোর বিনিময়ে তিনটি ছোট যুদ্ধজাহাজ এবং তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়েছিল। বহুল প্রতীক্ষিত ইলেক্ট্রোবোটগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি টাইপ XXIII উপকূলীয় ইলেক্ট্রোবোট ১৯৪৫ সালে সাতটি টহল দিয়েছিল এবং পাঁচটি ছোট মালবাহী জাহাজ ডুবিয়েছিল। বড় টাইপ XXI ইলেক্ট্রোবোটগুলোর মধ্যে মাত্র একটি যুদ্ধের শেষ হওয়ার আগে টহলে গিয়েছিল, কিন্তু সেটি কোনো সংঘর্ষে জড়ায়নি। যুদ্ধের শেষ মাসে, লাল ফৌজের আক্রমণে অনেক ইউ-বোট বাল্টিক বন্দরগুলো থেকে পালিয়ে যায়। নরওয়ের ঘাঁটিগুলোর দিকে পালানোর সময় আটটি ইলেক্ট্রোবোট এবং আরও নয়টি ইউ-বোট মিত্রশক্তির বিমান হামলায় ডুবে যায়।[৪৭]

১৯৪৩ সালের নভেম্বরে ইউএস নেভির কনসোলিডেটেড পিবিফোরওয়াই-১ লিবারেটর দ্বারা আক্রান্ত ইউ-৮৪৮।

আমেরিকান জলসীমায় শেষ অভিযানগুলো ১৯৪৫ সালের ৫-৬ই মে ঘটে, যেখানে ব্ল্যাক পয়েন্ট নামের একটি স্টিমার ডুবে যায় এবং দুটি পৃথক ঘটনায় ইউ-৮৫৩ এবং ইউ-৮৮১ ধ্বংস হয়। আটলান্টিকের যুদ্ধের শেষ অভিযানগুলো ছিল ৭-৮ই মে। ইউ-৩২০ ছিল যুদ্ধে ডুবে যাওয়া শেষ ইউ-বোট, যা একটি আরএএফ ক্যাটালিনা বিমান ডুবিয়েছিল; একই সময়ে, জার্মান আত্মসমর্পণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নরওয়েজীয় মাইনসুইপার এনওয়াইএমএস ৩৮২ এবং মালবাহী জাহাজ স্নেলান্ড আই ও অ্যাভনডেল পার্ক পৃথক ঘটনায় টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায়।

যুদ্ধের শেষে, ২২২টি ইউ-বোট তাদের ক্রুদের দ্বারা ডুবিয়ে দেওয়া হয়। বাকি ১৭৪টি ইউ-বোট, যেগুলো তখন সমুদ্রে বা বন্দরে ছিল, মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। যুদ্ধের পর বেশিরভাগই অপারেশন ডেডলাইট-এর মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়, তবে কিছু কিছু মিত্রশক্তির নৌবাহিনীতে ব্যবহৃত হয়েছিল। জার্মান আত্মসমর্পণের সময় ছয়টি ইউ-বোট জাপানে ছিল এবং সেগুলোকে জাপানিরা দখল করে নেয়।[৪৮]

জার্মানদের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন

[সম্পাদনা]

যুদ্ধজাহাজের উন্নতির সাথে সাথে টর্পেডোরও উন্নয়ন ঘটে। জার্মানরা তৈরি করে ফ্ল্যাচেন-আবসুখ-টর্পেডো (FAT)। এটি এমন একটি টর্পেডো ছিল, যা কনভয়ের পথ ধরে আড়াআড়িভাবে একটি পূর্ব-নির্ধারিত গতিপথে চলত। এছাড়াও, তারা G7es অ্যাকোস্টিক টর্পেডো তৈরি করে, যা মিত্রশক্তির কাছে জার্মান নেভাল অ্যাকোস্টিক টর্পেডো (GNAT) নামে পরিচিত ছিল। এটি লক্ষ্যবস্তুর প্রপেলারের শব্দের ওপর নির্ভর করে আঘাত হানত। প্রথম দিকে এই টর্পেডোগুলো খুব কার্যকর ছিল, কিন্তু মিত্রশক্তি দ্রুত এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলে। তারা কৌশলগতভাবে "স্টেপ-অ্যাসাইড" এবং প্রযুক্তিগতভাবে "ফক্সার" নামক পদ্ধতি ব্যবহার করে এর মোকাবেলা করে।

ফলাফল

[সম্পাদনা]
১৯৪৫ সালে নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেন্ট জন'স-এ দখল করা জার্মান সাবমেরিন ইউ-১৯০-এর উপর নাবিকরা হোয়াইট এনসাইন ওড়াচ্ছেন।

জার্মানরা ব্রিটেনে কৌশলগত সরবরাহের প্রবাহ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার ফলে ডি-ডে(নরম্যান্ডি অবতরণ) অবতরণের জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্য ও সরবরাহের সঞ্চয় সম্ভব হয়। ইউ-বোটের পরাজয় ছিল জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত করতে মিত্রশক্তির সৈন্য ও সরবরাহ সংগ্রহের জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে, ৭২,২০০ মিত্র নৌবাহিনী ও বণিক নাবিক প্রাণ হারান। জার্মানরা তাদের ৪০,০০০ সদস্যের ইউ-বোট বহরের তিন-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩০,০০০ ইউ-বোট নাবিককে হারায়।

অ্যাডমিরালটি পরে অনুমান করে যে, ১৯৩৮ সালে আয়ারল্যান্ডের কাছে তিনটি চুক্তি বন্দর হস্তান্তরের ফলে যুদ্ধের সময় ৩৬৮টি মিত্র জাহাজ এবং ৫,০৭০টি প্রাণহানি ঘটে।

বানিজ্যিক ক্ষতি

[সম্পাদনা]
অক্ষশক্তির আক্রমণের কারণে মিত্রশক্তি ও নিরপেক্ষ দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবির ক্ষতি ( জিআরটি )[৪৯] জার্মান এবং ইতালীয় সাবমেরিনের কারনে জাহাজ চলাচলের ক্ষতি [চ][৫০][৫১]
বছর সাবমেরিন বিমান মাইন সারফেস জাহাজ অন্যান্য মোট আটলান্টিকে জাহাজের সংখ্যা জিআরটি
1939 421,156 2,949 262,697 61,337 7,253 755,392 754,686 147 509,321
1940 2,156,158 580,074 509,889 511,615 203,905 3,991,641 3,654,511 520 2,462,867
1941 2,171,070 1,017,422 230,842 487,204 421,336 4,328,558 3,295,909 457 2,298,714
1942 6,266,215 700,020 104,588 396,242 323,632 7,790,697 6,150,340 1155 6,149,473
1943 2,588,906 424,411 111,658 56,986 43,177 3,225,138 2,200,410 452 2,510,304
1944 773,327 120,656 95,855 33,693 22,098 1,045,629 505,759 125 663,308
1945 283,133 44,351 93,663 10,222 7,063 438,432 366,843 63 284,476
মোট 14,659,965 2,889,883 1,409,192 1,557,299 1,028,464 21,575,490 16,928,460 2919 14,878,463
জার্মান সারফেস রেইডারদের সাফল্য
রেইডার সময়কাল জাহাজের সংখ্যা জিআরটি(টনেজ)
heavy cruiser Deutschland Sep 39 - Nov 39 2 6,962[৫২]
heavy cruiser Admiral Graf Spee Sep 39 - Dec 39 9 50,089[৫৩]
auxiliary cruiser Atlantis Mar 40 - Nov 41 22 145,697[৫৪]
auxiliary cruiser Orion Apr 40 - Aug 41 8 48,477[৫৫]
auxiliary cruiser Widder May 40- Oct 40 10 58,464[৫৬]
auxiliary cruiser Thor Jun 40 - Apr 41 12 96,602[৫৭]
auxiliary cruiser Pinguin Jun 40 - May 41 28 158,256[৫৮]
auxiliary cruiser Komet Jul 40 - Nov 41 6 41,567[৫৯]
heavy cruiser Admiral Scheer Oct 40 - Mar 41 17 113,223
heavy cruiser Admiral Hipper Nov 40 - Dec 40 1 6,078[৬০]
auxiliary cruiser Kormoran Dec 40 - Nov 41 11 68,274[৬১]
battleships Scharnhorst and Gneisenau Jan 41 - Mar 41 22 115,622
heavy cruiser Admiral Hipper Feb 41 8 34,042[৬২]
auxiliary cruiser Thor Nov 41 - Oct 42 10 56,037[৫৭]
auxiliary cruiser Michel Mar 42 - Mar 43 14 94,363[৬৩]
auxiliary cruiser Stier May 42 - Sep 42 4 30,728[৬৪]
auxiliary cruiser Michel May 43 - Oct 43 3 27,632[৬৩]
মোট 187 931,116

সমুদ্রের উপরের রণতরীর ক্ষয়ক্ষতি

[সম্পাদনা]

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বা চলাকালীন সময়ে জার্মানি ১৬টি বড় আকারের রণতরী তৈরি করেছিল: ৪টি যুদ্ধজাহাজ, ৬টি ভারী ক্রুজার এবং ৬টি হালকা ক্রুজার। এর মধ্যে কেবল অ্যাডমিরাল গ্রাফ স্পি ও বিসমার্ক আটলান্টিক মহাসাগরে যুদ্ধে ডুবেছিল। তিনটি ক্রুজার ১৯৪০ সালের এপ্রিলে নরওয়ে আক্রমণের সময় ডুবে যায় এবং শার্নহোর্স্ট আর্কটিক অঞ্চলে ডুবেছিল। ভারী ক্রুজার প্রিন্স ইউগেন এবং হালকা ক্রুজার ন্যুরেমবার্গ ছাড়া বাকি সব জাহাজই বন্দরে থাকা অবস্থায় বোমারু বিমানের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।

ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনীর নৌবহর সারা বিশ্বে যুদ্ধ করেছে এবং অনেক জাহাজ হারিয়েছে, কিন্তু জার্মান রণতরীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে তাদের মাত্র তিনটি জাহাজ ডুবেছিল: ব্যাটলক্রুজার হুড এবং হালকা ক্রুজার সিডনি ও ক্যারিবডিস।

ইউ-বোটগুলো যুদ্ধের সব অঞ্চলে মোট ১৭৫টি মিত্রবাহিনীর রণতরী ডুবিয়েছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগই ডুবেছিল ভূমধ্যসাগর বা আর্কটিক অঞ্চলে। ইউ-বোটের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল ছোট ছোট ডুবোজাহাজ-বিধ্বংসী জাহাজ, যেমন—ডেস্ট্রয়ার, ডেস্ট্রয়ার এসকর্ট, ফ্রিগেট এবং কর্ভেট। তবে, কিছু ক্ষেত্রে ইউ-বোটগুলো আটলান্টিকে বড় রণতরীও ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়: যুদ্ধজাহাজ রয়্যাল ওক বন্দরে থাকা অবস্থায় ডুবেছিল, বিমানবাহী রণতরী ক্যারেজাস ডুবেছিল ডুবোজাহাজ-বিরোধী টহল দেওয়ার সময়, এসকর্ট ক্যারিয়ার অডাসিটি, অ্যাভেঞ্জার ও ব্লক আইল্যান্ড ডুবেছিল কনভয়কে এসকর্ট করার সময়, এবং হালকা ক্রুজার ডানইডিন ডুবেছিল জার্মান আক্রমণকারীদের খোঁজে বের হওয়ার সময়।

ইউ-বোটের ক্ষতি

[সম্পাদনা]
daily average numbers[৬৫]
Total

fleet

Operational Engaged in

Atlantic

Sunk[৬৫] new

U-boats[৬৫]

Sep-Dec 1939 57 12 5 9 2
Jan-Mar 1940 51 11 5 6 4
Apr-Jun 1940 49 10 7 8 9
Jul-Sep 1940 56 10 8 5 15
Oct-Dec 1940 75 11 9 3 26
Jan-Mar 1941 102 20 12 5 31
Apr-Jun 1941 136 25 15 7 53
Jul-Sep 1941 182 30 17 6 70
Oct-Dec 1941 233 35 16 17 70
Jan-Mar 1942 272 45 13 11 49
Apr-Jun 1942 315 60 15 10 58
Jul-Sep 1942 352 95 25 32 61
Oct-Dec 1942 382 100 40 34 70
Jan-Mar 1943 418 110 50 40 70
Apr-Jun 1943 424 90 40 73 69
Jul-Sep 1943 408 60 20 71 68
Oct-Dec 1943 425 70 25 53 83
Jan-Mar 1944 445 65 30 60 62
Apr-Jun 1944 437 50 20 68 53
Jul-Sep 1944 396 40 15 79 50
Oct-Dec 1944 398 35 20 32 67
Jan-May 1945 349 45 20 153 93
Total 5962 1029 337 782 1133

বাণিজ্যিক জাহাজ

[সম্পাদনা]

যুক্তরাজ্য

[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিল ব্রিটিশ। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ মার্চেন্ট নেভির ৩০,০০০ এরও বেশি নাবিক মৃত্যুবরণ করেন। ২,৪০০ টিরও বেশি ব্রিটিশ জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। এই জাহাজগুলোতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের নাবিকরা কাজ করতেন। এদের মধ্যে ২৫% ছিলেন ভারত ও চীনের এবং ৫% ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার। ব্রিটিশ অফিসারদের পোশাক ছিল অনেকটা রয়্যাল নেভির ইউনিফর্মের মতোই। কিন্তু সাধারণ নাবিকদের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক ছিল না। এর ফলে, ব্রিটেনে ছুটিতে থাকাকালীন বেসামরিক নাগরিকরা প্রায়ই তাদের টিটকারি দিত ও হেনস্থা করত। কারণ তারা মনে করত, এই নাবিকরা সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে নাবিকদের একটি 'MN' লেখা ল্যাপেল ব্যাজ দেওয়া হয়, যা দেখে বোঝা যেত যে তারা মার্চেন্ট নেভিতে কর্মরত।

১৯৪৩ সালের মার্চ মাসে ৮৩ দিন ভেলায় থাকার পর মার্কিন নৌবাহিনীর টহল নৌকা থেকে উদ্ধার হওয়া বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকেরা।

ব্রিটিশ মার্চেন্ট নেভির নৌবহরটি বিভিন্ন বেসরকারি শিপিং লাইনের জাহাজ নিয়ে গঠিত ছিল, যেমন ব্রিটিশ ট্যাংকার কোম্পানির ট্যাংকার এবং এলারম্যান ও সিলভার লাইন্সের মালবাহী জাহাজ। ব্রিটিশ সরকারও, যুদ্ধ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের (MoWT) মাধ্যমে, যুদ্ধের সময় নতুন জাহাজ তৈরি করিয়েছিল, যেগুলো 'এম্পায়ার জাহাজ' (Empire ships) নামে পরিচিত ছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

[সম্পাদনা]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বিদ্যমান বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি ২,৭১০টি 'লিবার্টি শিপ' (Liberty ship) তৈরি করে, যেগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ছিল ৩ কোটি ৮৫ লক্ষ টন। এই সংখ্যাটি ছিল জার্মান ইউ-বোটগুলোর ধ্বংস করা ১ কোটি ৪০ লক্ষ টন জাহাজের তুলনায় বিপুল পরিমাণে বেশি।

কানাডা

[সম্পাদনা]

ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছ থেকে জার্মান জাহাজের চলাচল সম্পর্কে তথ্য পেয়ে, যুদ্ধ ঘোষণার দুই সপ্তাহ আগেই কানাডা তার সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত (conscript) করে নেয়। রয়্যাল কানাডিয়ান নেভি ১৯৩৯ সালের ২৬ আগস্ট তারিখে সমস্ত জাহাজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। যুদ্ধের শুরুতে কানাডার ৩৮টি সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে কানাডাতেই ৪০০টিরও বেশি কার্গো জাহাজ তৈরি করা হয়েছিল। কানাডার ৭০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হারিয়ে যায়। আনুমানিক ১,৫০০ মার্চেন্ট নাবিক নিহত হন, যাদের মধ্যে আটজন ছিলেন নারী।

যুদ্ধের শেষে, কানাডিয়ান নর্থ আটলান্টিকের কমান্ডার-ইন-চিফ, রিয়ার অ্যাডমিরাল লিওনার্ড মারে মন্তব্য করেছিলেন, "...আটলান্টিকের যুদ্ধ কোনো নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনী জেতেনি, এই যুদ্ধ জিতেছে ব্রিটিশ ও মিত্রবাহিনীর মার্চেন্ট নেভির সাহস, প্রতিকূলতায় দৃঢ়তা এবং সংকল্প।"

নরওয়ে

[সম্পাদনা]

যুদ্ধের আগে, নরওয়ের মার্চেন্ট নেভি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ছিল এবং এর জাহাজগুলো ছিল সবচেয়ে আধুনিক। জার্মান এবং মিত্রশক্তি উভয়ই নরওয়ের বাণিজ্যিক নৌবহরের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিল। ১৯৪০ সালের এপ্রিলে জার্মানি নরওয়ে আক্রমণ করার পর, উভয় পক্ষই এই জাহাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। নরওয়ের নাৎসি সমর্থিত পুতুল নেতা ভিদকুন কুইজলিং সমস্ত নরওয়েজিয়ান জাহাজকে জার্মান, ইতালীয় বা নিরপেক্ষ বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তার নির্দেশ কেউ মানেনি। সমস্ত নরওয়েজিয়ান জাহাজ মিত্রশক্তির অধীনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। নরওয়ের মার্চেন্ট নেভির জাহাজগুলোকে সরকারিভাবে পরিচালিত 'নর্ট্রাশিপ' (Nortraship) এর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যার সদর দফতর ছিল লন্ডন ও নিউইয়র্কে।

'নর্ট্রাশিপ'-এর আধুনিক জাহাজগুলো, বিশেষ করে ট্যাংকারগুলো, মিত্রশক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুদ্ধের সময় ব্রিটেনে সরবরাহ করা তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নরওয়ের ট্যাংকারগুলো বহন করত। তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে নরওয়ের ৬৯৪টি জাহাজ ডুবে যায়, যা ছিল তাদের মোট জাহাজের ৪৭%। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে নরওয়ের বাণিজ্যিক জাহাজের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১,৩৭৮টি। ৩,৭০০ জনেরও বেশি নরওয়েজিয়ান মার্চেন্ট নাবিক মৃত্যুবরণ করেন।[৬৬]

মূল্যায়ন

[সম্পাদনা]

জি. এইচ. পার্সাল মনে করেন যে[৬৭], "জার্মানরা" ইংল্যান্ডকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার "কাছাকাছি চলে এসেছিল", কিন্তু তারা তাদের যুদ্ধের প্রাথমিক সাফল্যকে "কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়"। ব্লেয়ার ও অ্যালান লেভিনের মতো অন্যরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন[৬৮]; লেভিন বলেন, এটি একটি "ভ্রান্ত ধারণা" এবং তারা এই লক্ষ্য অর্জনের "কাছাকাছিও কখনো আসতে পেরেছিল কিনা তা সন্দেহজনক"।[৬৯]

ইউ-বোটের সাফল্য, এর বিশেষজ্ঞ নাবিক ও তাদের স্কোর, আক্রান্ত কনভয় এবং ডোবানো জাহাজের ওপর মনোযোগ দেওয়ার ফলে জার্মান নৌবাহিনী বা ক্রিসমেরিনের (Kriegsmarine) বহুবিধ ব্যর্থতা আড়ালে থেকে যায়। বিশেষত, এর কারণ হলো ইউ-বোট দ্বারা ডোবানো বেশিরভাগ জাহাজ কনভয়ে ছিল না, বরং একা চলছিল বা কনভয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

এই অভিযান চলাকালীন কোনো সময়েই ব্রিটেনে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়নি[৭০]; এমনকি বিসমার্ক সংকটের সময়ও কনভয়গুলো যথারীতি চলছিল (যদিও আরও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা বা এসকর্ট সহ)। আটলান্টিক অভিযান চলাকালীন, আটলান্টিকগামী কনভয়গুলোর মধ্যে মাত্র ১০% আক্রমণের শিকার হয়েছিল এবং আক্রান্ত কনভয়গুলোর জাহাজগুলোর মধ্যে গড়ে মাত্র ১০% ডুবেছিল। মোটের ওপর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে যাতায়াতকারী ৯৯% এরও বেশি জাহাজ সফলভাবে তাদের যাত্রা সম্পন্ন করেছিল।[৭১]

তাদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, অক্ষশক্তি ইউরোপ মুক্তির জন্য মিত্রবাহিনীর আক্রমণকারী সৈন্যদের সমাবেশ ঠেকাতে পারেনি। ১৯৪২ সালের নভেম্বরে, আটলান্টিক অভিযানের চরম পর্যায়ে, মার্কিন নৌবাহিনী কোনো বাধা ছাড়াই, এমনকি কারও নজরে না এসেই, 'অপারেশন টর্চ' আক্রমণকারী নৌবহরকে আটলান্টিক জুড়ে ৩,০০০ মাইল (৪,৮০০ কিমি) পথ এসকর্ট করে নিয়ে যায়।[৭২][৭৩] ১৯৪৩ ও ১৯৪৪ সালে মিত্রবাহিনী কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি ছাড়াই ৩০ লক্ষ আমেরিকান ও মিত্রবাহিনীর সৈন্যকে আটলান্টিক পার করায়। ১৯৪৫ সাল নাগাদ, মার্কিন নৌবাহিনী মধ্য-আটলান্টিকে ভি-উইপন (V-weapons) বহনকারী একটি সন্দেহভাজন উলফ-প্যাককে (wolf-pack) সামান্য চেষ্টাতেই নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয়েছিল।[৭৪]

তৃতীয়ত, মিত্রবাহিনীর মতো জার্মানরা কখনোই ব্রিটেনের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ তৈরি করতে পারেনি। তারা সবচেয়ে মূল্যবান কার্গো, অর্থাৎ যুদ্ধ সরঞ্জাম বহনকারী পূর্বমুখী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তাদের আক্রমণকে কেন্দ্রীভূত করতেও পারেনি। পরিবর্তে, তারা একটি ধীরগতির ক্ষয়ক্ষতির 'টনেজ যুদ্ধে' (tonnage war) সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হয়েছিল। এই যুদ্ধে জেতার জন্য, ব্রিটেনের জাহাজ নির্মাণ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে এবং এর বাণিজ্যিক নৌ-শক্তি হ্রাস করার জন্য ইউ-বোট বাহিনীকে প্রতি মাসে ৩,০০,০০০ জিআরটি (GRT) ডোবানোর প্রয়োজন ছিল।

যুদ্ধের প্রথম ২৭ মাসের মধ্যে মাত্র চারটি মাসে জার্মানি এই লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছিল। ডিসেম্বর ১৯৪১-এর পর, যখন মার্কিন বাণিজ্যিক নৌবহর এবং জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো ব্রিটেনের সঙ্গে যোগ দেয়, তখন লক্ষ্যমাত্রা কার্যত দ্বিগুণ হয়ে যায়। ফলে, অক্ষশক্তির প্রতি মাসে ৭,০০,০০০ জিআরটি ডোবানোর প্রয়োজন ছিল। মার্কিন জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ কার্যকর হওয়ায় এই লক্ষ্য আরও বেড়ে যায়। ৭,০০,০০০ টনের লক্ষ্যমাত্রাটি মাত্র এক মাসে অর্জিত হয়েছিল, যা হলো নভেম্বর ১৯৪২। মে ১৯৪৩-এর পর, জাহাজ ডোবানোর গড় হার সেই সংখ্যার দশভাগের একভাগের চেয়েও কমে যায়। এছাড়াও, প্রতিবেদনগুলোতে জিআরটি (গ্রস রেজিস্টার টনেজ, যা ১০০ ঘনফুট এককের একটি আয়তন, ওজন নয়) এবং ডিসপ্লেসমেন্ট (displacement, যা জাহাজের প্রকৃত ওজন)-এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয় না। সুতরাং, ১,০০০ জিআরটির একটি জাহাজ ডোবানো মানে ১,০০,০০০ ঘনফুট আবদ্ধ স্থান ধ্বংস করা, যার সঙ্গে জাহাজটির বহনযোগ্য কার্গোর পরিমাণ বা ওজনের কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ক ছিল না।

যুদ্ধের শেষ নাগাদ মিত্রশক্তি ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টনেরও বেশি নতুন জাহাজ তৈরি করেছিল।[৭৫]

জার্মান অবরোধ সাফল্যের কাছাকাছি এসেছিল—এই ভুল ধারণার কারণ সম্ভবত জার্মান ও ব্রিটিশ উভয় লেখকের যুদ্ধ-পরবর্তী লেখাগুলোতে পাওয়া যায়। ব্লেয়ার এই বিকৃতির জন্য "প্রচারকদের" দায়ী করেন, যারা "জার্মান সাবমেরিন চালকদের সাফল্যকে মহিমান্বিত ও অতিরঞ্জিত করেছিল"। অন্যদিকে তিনি বিশ্বাস করেন যে, মিত্রবাহিনীর লেখকদেরও "বিপদকে বাড়িয়ে চড়িয়ে দেখানোর নিজস্ব কারণ ছিল"।[৬৮]

ড্যান ভ্যান ডার ভ্যাট মনে করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বা কানাডা এবং ব্রিটেনের অন্যান্য ডোমিনিয়নের মতো নয়—যারা মহাসাগরীয় দূরত্ব দ্বারা সুরক্ষিত ছিল—ব্রিটেন ছিল জার্মান ঘাঁটিগুলোর সবচেয়ে কাছের আটলান্টিক সরবরাহ রুটের শেষ প্রান্তে; ব্রিটেনের জন্য এটি ছিল এক জীবনরেখা। এ কারণেই চার্চিল উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।[৭৬] এর সঙ্গে মার্চ ১৯৪৩-এ, এক মাসের মধ্যে কয়েকটি বড় কনভয় যুদ্ধের কারণে কনভয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা টলে গিয়েছিল, এমনকি ব্রিটেন এটি পরিত্যাগ করার কথাও ভেবেছিল।[৭৭] তারা বুঝতে পারেনি যে ইউ-বোটগুলো ততদিনে কার্যত পরাজিত হয়ে গেছে। ব্লেয়ার উপসংহারে বলেন, এগুলো ছিল "হুমকি সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত হতাশাবাদী মূল্যায়ন": "জার্মান ইউ-বোট বাহিনী কখনোই আটলান্টিকের যুদ্ধ জেতার বা গ্রেট ব্রিটেনের পতন ঘটানোর কাছাকাছিও আসতে পারেনি"।[৭৮]

প্রতি মাসে জাহাজ পরিবহন এবং ইউ-বোট ধ্বংস

[সম্পাদনা]
বাণজ্যিক জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি
  এনিগমার আগে
  +
  + সেন্ট্রিমেট্রিক রাডার
ইউ-বোটের ক্ষতি

ইতিহাসবিদরা ইউ-বোট বিরোধী ব্যবস্থাগুলোর আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে মতভেদ করেন। ম্যাক্স হেস্টিংস বলেন, “শুধুমাত্র ১৯৪১ সালেই, আল্ট্রা [জার্মান কোড ভাঙার কাজ] মিত্রপক্ষের ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টন জাহাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।” এটি ছিল ৪০ শতাংশ থেকে ৫৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির হ্রাস। একটি ইতিহাস, যা যুদ্ধের পর জার্মান আর্কাইভের উপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটির জন্য একজন প্রাক্তন ইউ-বোট কমান্ডার এবং ডোনিৎজের জামাতা লিখেছিলেন, তাতে বলা হয় যে, বেশ কয়েকটি বিস্তারিত তদন্তে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তাদের অভিযান কোড ভাঙার কারণে বিঘ্নিত হয়নি এবং তাদের পরাজয়ের কারণ ছিল “প্রথমত শত্রুপক্ষের রাডারের অসাধারণ উন্নয়ন...”। তথ্যের গ্রাফগুলো তিনটি যুগে বিভক্ত করার জন্য রঙ দিয়ে কোড করা হয়েছে— এনিগমা কোড ভাঙার আগে, কোড ভাঙার পর এবং সেন্টিমেট্রিক রাডার প্রবর্তনের পর, যা জলের পৃষ্ঠের উপরে সাবমেরিনের কনিং টাওয়ার এবং এমনকি পেরিস্কোপও শনাক্ত করতে পারত। স্পষ্টতই, তথ্যের এই বিভাজন যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষের উন্নত অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাগুলোকে উপেক্ষা করে, তাই এর ব্যাখ্যা সীমিত রাখতে হবে। শুধুমাত্র কোড ভাঙা ক্ষয়ক্ষতি কমায়নি, বরং ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহভাবে বাড়তে থাকে। আরও বেশি ইউ-বোট ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তখনও চালু থাকা ইউ-বোটের সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল। উন্নত রাডার কার্যকর হওয়ার পর জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি নাটকীয়ভাবে কমে যায়, যা যুদ্ধের প্রথম দিকের মাসগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে (p=0.99) কম ছিল। মিত্রপক্ষের উন্নত রাডারের উন্নয়ন শুরু হয়েছিল ১৯৪০ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এখনও যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। তখন হেনরি টিজার্ড এবং এ. ভি. হিল আমেরিকানদের সঙ্গে ব্রিটিশ গোপন গবেষণা ভাগ করে নেওয়ার অনুমতি পান, যার মধ্যে ছিল ক্যাভিটি ম্যাগনেট্রন, যা প্রয়োজনীয় উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও তরঙ্গ তৈরি করে। তবে সব পক্ষই হেস্টিংসের এই কথার সাথে একমত যে, "...দেশের সেরা বেসামরিক প্রতিভাদের একত্রিত করে যুদ্ধ প্রচেষ্টার সর্বোচ্চ স্তরে তাদের সম্পৃক্ত করা ছিল ব্রিটিশদের একটি অসামান্য সাফল্যের গল্প।"

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

[সম্পাদনা]

চলচ্চিত্র

[সম্পাদনা]
  • U-Boote westwärts!, ১৯৪১ সালের একটি প্রচারমূলক চলচ্চিত্র।
  • Action in the North Atlantic, ১৯৪৩ সালের একটি আমেরিকান যুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র। এটিতে ইউএস মার্চেন্ট মেরিনের নাবিকদের একটি ইউ-বোটের সঙ্গে যুদ্ধের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
  • Corvette K-225, ১৯৪৩ সালের একটি আমেরিকান চলচ্চিত্র। এটিতে রয়্যাল কানাডিয়ান নেভির কনভয় এসকর্টের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে।
  • San Demetrio London, ১৯৪৩ সালের চলচ্চিত্র। জার্মান ক্রুজার অ্যাডমিরাল শেয়ার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর জাহাজের কিছু ক্রু কর্তৃক একটি ট্যাংকার উদ্ধারের বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে এটি নির্মিত।
  • Western Approaches, ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ রঙিন চলচ্চিত্র। একটি লাইফবোটে বণিক নাবিকদের অভিজ্ঞতার নাটকীয় চিত্র এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
  • The Cruel Sea, ১৯৫৩ সালের চলচ্চিত্র। এটিতে যুদ্ধের সময় রয়্যাল নেভির এসকর্ট ক্রুদের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
  • The Enemy Below, ১৯৫৬ সালের চলচ্চিত্র। একজন আমেরিকান ডেস্ট্রয়ার ক্যাপ্টেন কীভাবে একটি ইউ-বোট ক্যাপ্টেনের সঙ্গে চালাকি করে, তা এখানে দেখানো হয়েছে।
  • Sink the Bismarck!, ১৯৬০ সালের চলচ্চিত্র। এটি জার্মান যুদ্ধজাহাজ খোঁজের ঘটনা নিয়ে নির্মিত।
  • Das Boot, ১৯৮১ সালের জার্মান চলচ্চিত্র। এটি একটি জার্মান ইউ-বোট এবং এর ক্রুদের নিয়ে নির্মিত।
  • U-571, ২০০০ সালের চলচ্চিত্র। ছদ্মবেশী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবমেরিনারদের দ্বারা একটি ইউ-বোটে প্রবেশ করার ঘটনা নিয়ে এটি নির্মিত।
  • In Enemy Hands, ২০০৪ সালের চলচ্চিত্র। একটি ইউ-বোটে আমেরিকান নাবিকদের বন্দী হওয়ার ঘটনা নিয়ে এটি নির্মিত।
  • Greyhound, ২০২০ সালের চলচ্চিত্র। এটিতে একজন আমেরিকান কমান্ডারকে ইউ-বোট থেকে একটি কনভয়কে রক্ষা করতে দেখা যায়।
  • Comandante, ২০২৩ সালের চলচ্চিত্র। ইতালীয় সাবমেরিন কমান্ডান্তে ক্যাপরিনেল্লি দ্বারা বেলজিয়ান জাহাজ কাবালো ডুবে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে এটি নির্মিত।[৭৯]
  • The Ministry of Ungentlemanly Warfare, ২০২৪ সালের অ্যাকশন কমেডি যুদ্ধ চলচ্চিত্র। এটিতে Operation Postmaster-এর একটি কাল্পনিক সংস্করণ এবং উইনস্টন চার্চিল-এর এস.ও.ই.-এর ভূমিকা দেখানো হয়েছে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ Billinis 2019।
  2. ↑ অস্ট্রেলিয়া নৌবাহিনী।
  3. ↑ NZ govt।
  4. ↑ Collins 1964, পৃ. 248।
  5. 1 2 White 2008, পৃ. 2।
  6. 1 2 Bennett 2007, পৃ. 301।
  7. ↑ Bowyer 1979, পৃ. 158।
  8. ↑ Bennett 2007, পৃ. 302।
  9. ↑ Giorgerini 2002, পৃ. 424।
  10. ↑ Blair 1996a, পৃ. xiii।
  11. ↑ Woodman 2004, পৃ. 1।
  12. ↑ Carney, Robert B., Admiral, USN. "Comment and Discussion" United States Naval Institute Proceedings January 1976, p. 74
  13. ↑ United States Strategic Bombing Survey Vol 3, Effects of Strategic Bombing on the German War Economy, 1945, p. 144.
  14. ↑ Edgerton 2011, পৃ. 158।
  15. ↑ Blair 1996a, পৃ. 45-49।
  16. ↑ Burn 1993, পৃ. 20, 326-328।
  17. ↑ Blair 1996a, পৃ. 73-74।
  18. ↑ Milner 2011, পৃ. 11।
  19. ↑ Blair 1996a, পৃ. 71।
  20. ↑ Blair 1996a, পৃ. 158-160।
  21. ↑ Williamson 2010, পৃ. 43।
  22. ↑ Blair 1996a, পৃ. 485।
  23. ↑ HMS Hood 1920 ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে, Royal Navy
  24. ↑ Hellwinkel 2014, Kindle location 731–738 of 4855।
  25. ↑ Garzke ও Dulin 1985, পৃ. 145-146।
  26. ↑ Koop ও Schmolke 2014, পৃ. 52-53,111।
  27. ↑ Roskill 1957, পৃ. 358–359।
  28. ↑ Morison 2001, পৃ. 211–212।
  29. ↑ Costello ও Hughes 1977, পৃ. 308।
  30. 1 2 Rickard, J (১ জুন ২০০৭)। "Leigh Light"। History of War। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।
  31. ↑ Williams 2003, পৃ. 244।
  32. ↑ Joseph, Claudia (২০০২)। "Revealed: the careless mistake by Bletchley's Enigma code-crackers that cost Allied lives;"। The Independent। সংগ্রহের তারিখ ৯ এপ্রিল ২০১৯।
  33. ↑ Smith 2012, পৃ. 213।
  34. ↑ Bowling 1969, পৃ. 52।
  35. ↑ Terraine, John (১৯৯০)। Business in Great Waters: The U-Boat Wars 1916–1945। London, UK: Mandarin Paperbacks। পৃ. ৭৫৬। আইএসবিএন ০-৩৩০-২৬১৭২-X।
  36. 1 2 Carey 2004।
  37. ↑ Morison 2001, পৃ. 376।
  38. ↑ Votaw, 1950, pp. 10579ff, and 1951, p. 93.
  39. ↑ Gastaldoni, 1993. From p. 153.
  40. 1 2 Helgason, Guðmundur। "Loss listings"। German U-boats of WWII – uboat.net। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুলাই ২০১৫।
  41. ↑ Carey 2004, পৃ. 119।
  42. ↑ Barone 2013, Chapter 2।
  43. ↑ Carruthers 2011, পৃ. 190।
  44. ↑ Blair 1996b, পৃ. 377।
  45. ↑ Costello ও Hughes 1977, পৃ. 295-296।
  46. ↑ Blair 1996b, পৃ. 607-619।
  47. ↑ Blair 1996b, পৃ. 761।
  48. ↑ Blair 1996b, পৃ. 818-819।
  49. ↑ Costello ও Hughes ১৯৭৭, পৃ. 305।
  50. ↑ Blair 1996a, পৃ. 771।
  51. ↑ Blair 1996b, পৃ. 820।
  52. ↑ Rohwer 2005, পৃ. 5-6।
  53. ↑ Rohwer 2005, পৃ. 5-10।
  54. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 27।
  55. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 57।
  56. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 61।
  57. 1 2 Muggenthaler 1981, পৃ. 63।
  58. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 68।
  59. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 69।
  60. ↑ Rohwer 2005, পৃ. 53।
  61. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 135।
  62. ↑ Rohwer 2005, পৃ. 58-59।
  63. 1 2 Muggenthaler 1981, পৃ. 203।
  64. ↑ Muggenthaler 1981, পৃ. 211।
  65. 1 2 3 Costello ও Hughes 1977, পৃ. 305।
  66. ↑ Milner, Marc (১ জুন ২০০৮)। "The Battle That Had to Be Won"। U.S. Naval Institute (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুলাই ২০২৪।
  67. ↑ Pearsall 1994, পৃ. 7।
  68. 1 2 Blair 1996a, পৃ. xii।
  69. ↑ Levine 1991, পৃ. 375।
  70. ↑ Francis, Timothy Lang (২০০১)। Poseidon's tribute: Maritime vulnerability, industrial mobilization and the Allied defeat of the U-boats, 1939–1945 (অভিসন্দর্ভ)। University of Maryland, College Park। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুলাই ২০২৪।
  71. ↑ Faulkner, Marcus; Bell, Christopher M., সম্পাদকগণ (২০১৯)। Decision in the Atlantic: the Allies and the longest campaign of the Second World War। New perspectives on the Second World War (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। Lexington, Kentucky, United States of America: The University Press of Kentucky। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৯৪৯৬৬৮-০০-১।
  72. ↑ Patch, John (২০০৮)। "FORTUITOUS ENDEAVOR: Intelligence and Deception in Operation Torch"। Naval War College Review। ৬১ (4): ৭৩–৯৮। আইএসএসএন 0028-1484। জেস্টোর 26396965।
  73. ↑ Allard, Dean (১৯ জানুয়ারি ২০২৩)। "The U.S. Navy Comes Ashore in the Med"। U.S. Naval Institute (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুলাই ২০২৪।
  74. ↑ Blair, Clay (২০০০)। Hitler's U-Boat War The Hunted, 1942-1945 (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। Random House।
  75. ↑ Smith, Kevin (৭ মার্চ ১৯৯৬), Conflict Over Convoys: Anglo-American Logistics Diplomacy in the Second World War, Cambridge University Press, ডিওআই:10.1017/cbo9780511523755.001, সংগ্রহের তারিখ ২১ জুলাই ২০২৪
  76. ↑ Costello ও Hughes 1977, পৃ. 210।
  77. ↑ Roskill 1961, পৃ. 375।
  78. ↑ Blair 1996b, পৃ. xii।
  79. ↑ Vivarelli 2022।

টেবিলটপ গেম

[সম্পাদনা]
  • Submarine, ১৯৭৬ সালে অ্যাভালন হিল দ্বারা তৈরি একটি স্ট্র্যাটেজি গেম।
  • U-Boat, ১৯৭৬ সালে হেরিটেজ মডেলস দ্বারা তৈরি একটি মিনিয়েচার স্ট্র্যাটেজি গেম।
  • U-Boat, ১৯৫৯ সালে অ্যাভালন হিল দ্বারা তৈরি একটি স্ট্র্যাটেজি গেম।
  • Wolfpack, ১৯৭৪ সালে সিমুলেশনস পাবলিকেশনস, ইনকর্পোরেশন দ্বারা তৈরি একটি সলিটায়ার স্ট্র্যাটেজি গেম।
  • War at Sea, ১৯৭৫ সালে অ্যাভালন হিল দ্বারা তৈরি একটি স্ট্র্যাটেজি গেম।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]

অফিসিয়াল ইতিহাস

[সম্পাদনা]
  • Behrens, C. B. A. (১৯৫৫)। Merchant Shipping and the Demands of War। History of the Second World War: United Kingdom Civil Series। লন্ডন: HMSO and Longmans। ওসিএলসি 557756251।
  • ডগলাস, উইলিয়াম এ.বি., রজার সার্টি এবং মাইকেল হুইটবি, No Higher Purpose: The Official Operational History of the Royal Canadian Navy in the Second World War, 1939–1943, ভলিউম ২ পার্ট ১, ভ্যানওয়েল পাবলিশিং ২০০২, আইএসবিএন ১-৫৫১২৫-০৬১-৬
  • ডগলাস, উইলিয়াম এ.বি., রজার সার্টি এবং মাইকেল হুইটবি, A Blue Water Navy: The Official Operational History of the Royal Canadian Navy in the Second World War, 1943–1945, ভলিউম ২ পার্ট ২, ভ্যানওয়েল পাবলিশিং ২০০৭, আইএসবিএন ১-৫৫১২৫-০৬৯-১
  • মরিসন, এস.ই. The Two Ocean War এবং History of United States Naval Operation in World War II ১৫টি ভলিউমে। ভলিউম ১ The Battle of the Atlantic এবং ভলিউম ১০ The Atlantic Battle Won আটলান্টিকের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করে।
  • শুল, জোসেফ, Far Distant Ships: An Official Account of Canadian Naval Operations in World War II, কিংস প্রিন্টার, অটোয়া, ১৯৫২ – এটি স্টোডার্ট পাবলিশিং, টরন্টো দ্বারা ১৯৮৭ সালে পুনঃমুদ্রিত হয়, আইএসবিএন ০-৭৭৩৭-২১৬০-৬
  • [Aircraft against U-Boats (নিউজিল্যান্ডের অফিসিয়াল ইতিহাস)
জীবনী
অভিযানের সাধারণ ইতিহাস
  • Alexander, C. Hugh O'D. (c. ১৯৪৫)। Cryptographic History of Work on the German Naval Enigma। CCR 239। Kew: The National Archives। HW 25/1। সংগ্রহের তারিখ ৮ নভেম্বর ২০১৭।
  • ডিম্বলবি, জোনাথন, The Battle of the Atlantic: How the Allies Won the War (ভাইকিং, ২০১৬)
  • ডোহার্টি, রিচার্ড, 'Key to Victory: The Maiden City in the Battle of the Atlantic'
  • Doherty, Richard (২০১৫)। Churchill's Greatest Fear: The Battle of the Atlantic, 3 September 1939 to 7 May 1945। বার্নসলে, সাউথ ইয়র্কশায়ার ইংল্যান্ড: Pen & Sword Military। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৭৩৮৩-৪০০-২।
  • ফেয়ারব্যাঙ্ক, ডেভিড। Bitter Ocean: The Battle of the Atlantic, 1939–1945
  • গ্যানন, মাইকেল। ১৯৯০। Operation Drumbeat: The Dramatic True Story of Germany's First U-Boat Attacks Along the American Coast in World War II। হার্পার অ্যান্ড রো। আইএসবিএন ০-০৬-০৯২০৮৮-২
  • গ্যানন, মাইকেল। ১৯৯৮। Black May: The Epic Story of the Allies' Defeat of the German U-Boats in May 1943। ডেল। আইএসবিএন ০-৪৪০-২৩৫৬৪-২
  • হ্যাসলপ, ডেনিস। Britain, Germany and the Battle of the Atlantic: A Comparative Study (এঅ্যান্ডসি ব্ল্যাক, ২০১৩)
  • কিগান, জন। Atlas of World War II (২০০৬)
  • ম্যাকিনটায়ার, ডোনাল্ড। The Battle of the Atlantic। (লন্ডন ১৯৬১)। একজন ব্রিটিশ এসকর্ট গ্রুপ কমান্ডারের লেখা একটি চমৎকার একক-ভলিউমের ইতিহাস।
  • মিলনার, মার্ক। "The Atlantic War, 1939–1945: The Case for a New Paradigm।" Global War Studies ১৪.১ (২০১৭): ৪৫–৬০।
  • ও'কনর, জেরোম এম, "FDR's Undeclared War", [www.historyarticles.com]
  • রোহওয়ার, ড. জার্গেন। The Critical Convoy Battles of March 1943 (লন্ডন: ইয়ান অ্যালান ১৯৭৭)। আইএসবিএন ০-৭১১০-০৭৪৯-৭। ইউ-বোটের পরাজয়ের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ।
  • সার্টি, রজার, The Battle of the Atlantic: The Royal Canadian Navy's Greatest Campaign, 1939–1945, সিইএফ বুকস, অটোয়া, ২০০১ আইএসবিএন ১-৮৯৬৯৭৯-৪৪-০
  • টেরাইন, জন, Business in Great Waters, (লন্ডন ১৯৮৭) ওয়ার্ডসওয়ার্থ মিলিটারি লাইব্রেরি। ১৯১৭-১৯৪৫ সালের ইউ-বোট ক্যাম্পেইনের সেরা একক-ভলিউম অধ্যয়ন।
  • ভ্যান ডার ভ্যাট, ড্যান। The Atlantic Campaign, ১৯৮৮ আইএসবিএন ০-৩৪০-৩৭৭৫১-৮
  • উইলিয়ামস, অ্যান্ড্রু, The Battle of the Atlantic: Hitler's Gray Wolves of the Sea and the Allies' Desperate Struggle to Defeat Them

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]
  1. ↑ 1941–1945
  2. ↑ 1942–1945
  3. ↑ This included the French Third Republic from 1939 to 1940; the Free French Naval Forces from 1940 to 1944; and the Provisional Government of the French Republic from 1944 to 1945
  4. ↑ 1940–1943
  5. ↑ The Q attachment was a later addition to ASDIC, providing an extra beam that looked directly down. This gave an accurate depth of the target
  6. ↑ Includes ships sunk by submarine laid mines
উদ্ধৃতি ত্রুটি: "lower-alpha" নামক গ্রুপের জন্য <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোন সঙ্গতিপূর্ণ <references group="lower-alpha"/> ট্যাগ পাওয়া যায়নি